রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে গত বুধবার বিকেলে সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর গভীর রাতে উদ্ধারকারী জাহাজের সহায়তায় বাসটি নদী থেকে তোলা হয়।
জানা গেছে, বাসটি কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। প্রথমে বাসে ছয়জন যাত্রী থাকলেও দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছানোর সময় যাত্রীসংখ্যা বেড়ে প্রায় ৪৫ জনে দাঁড়ায়। ঘাট এলাকায় পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়।
দুর্ঘটনার পর উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে বিনা ময়নাতদন্তে হস্তান্তর করেছে জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে প্রতিটি মরদেহের বিপরীতে দাফনের জন্য ২৫ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৮ জন রাজবাড়ী জেলার বাসিন্দা বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্য এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ছয় সদস্যের পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। শনিবার (২৮ মার্চ ২০২৬) দুপুরে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির সদস্যরা দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাট এলাকা পরিদর্শন করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় ফেরিঘাটে কয়েকটি যানবাহন ফেরির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। ওই সময় বাসটি হঠাৎ দ্রুতগতিতে সামনে এগিয়ে গিয়ে পন্টুনের রেলিংয়ে ধাক্কা খেয়ে নদীতে পড়ে যায়।
দুর্ঘটনায় নিহত হন যাত্রী রেজাউল করিমের স্ত্রী মর্জিনা আক্তার (৩২) ও তাঁদের মেয়ে রাফিয়া আক্তার (১২)। রেজাউল করিম বলেন, ‘বাসের সি-১ ও সি-২ নম্বর আসনে বসে ছিলেন মর্জিনা ও রাফিয়া। এ সময় মর্জিনা পেয়ারা খেতে চাইলে কিনে দেই। আমাকে একপ্রকার জোর করে খাইয়ে দেয়। আর বলে আসরের নামাজের সময় চলে যাচ্ছে, নামাজ আদায় করে নেই। তাঁর সিটের সামনে আমি আড়াল হয়ে দাঁড়ালে মর্জিনা আসরের নামাজ আদায় করে। পরে বাস থেকে নেমে আমি দুই বছর চার মাস বয়সী মেয়ে রাইসাকে কোলে নিয়ে পন্টুনে হাঁটছিলাম। কিছুক্ষণ পর শুনতে পাই, বাস ব্রেক ফেল করেছে। পরে আমি খেয়াল করেছি চালক আরমান অনেক চেষ্টা করেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না। সরাসরি বাসটি চলে যায় নদীতে। পরে মধ্যরাতে যখন বাসটি টেনে তোলা হয় তখন আমার স্ত্রী, সন্তান এমনকি বাসচালকের লাশ আমিই শনাক্ত করি।’
বাসটির আরেক যাত্রী চাঁদপুরের একটি কলেজের শিক্ষক সাকিব হোসেন বলেন, তিনি ঈদের ছুটিতে শ্বশুরবাড়ি কালুখালীর গান্ধিমারা এলাকায় এসেছিলেন। সেদিন বিকেলে সেখান থেকে বাসে ওঠেন। ঘাটে পৌঁছানোর পর ফেরির জন্য প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। তিনি বলেন, ‘একটি ফেরিকে ঘাটে ভিড়তে দেখে বাস থেকে নেমে ফেরির সামনে আসি। কিছুক্ষণ পর ফেরি থেকে দুই-তিনটি গাড়ি আনলোডের পর পেছনে ফিরে দেখি আমি যে বাসে ছিলাম ওই বাসটি হঠাৎ আসতেছে। আমি ড্রাইভারের দিকে লক্ষ করে দেখেছি তিনি কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছেন না। প্রায় ২৫-৩০ কিলোমিটার গতিতে বাসটি পন্টুনে এসে প্রথমে রেলিংয়ে ধাক্কা খেয়ে অর্ধেকটা, পরে পুরোটাই নদীতে পড়ে যায়।’
ঘটনার সময় ৩ নম্বর ফেরিঘাটের পন্টুনে দায়িত্বে ছিলেন লস্কর আব্দুর রহিম। তিনি বলেন, ‘হাসনাহেনা ফেরি থেকে কেবলমাত্র দুটি গাড়ি আনলোড হয়েছে। ওই সময় সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসচালক গাড়িটি চালু করে, আমি নিজে দেখি। পরমুহূর্তে গাড়িটি দ্রুতগতিতে সরাসরি পন্টুনের রেলিংয়ের সাথে আঘাত করে নদীতে পড়ে যায়। আমি তখন দ্রুত সেখান থেকে সটকে পড়ি। তখন হাসনাহেনা ফেরির গাড়ি আনলোড বন্ধ করে দ্রুত বয়া, রশি, গামছা হাতের কাছে যা ছিল তাই নদীতে ফেলে যাত্রীদের ওঠানোর ব্যবস্থা করি। এ সময় ৬-৭ জন যাত্রীকে টেনে ওপরে তোলা হয়।’
পরে উদ্ধারকাজে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড ও বিআইডব্লিউটিএর ডুবুরি দল সমন্বিতভাবে অংশ নেয়। ডুবে যাওয়ার প্রায় ছয় ঘণ্টা পর বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে উদ্ধারকারী জাহাজের সাহায্যে বাসটি নদী থেকে টেনে তোলা হয়।
সিএ/এমই


