রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জুলাই যোদ্ধা’ নামের একটি সংগঠনের দাবির মুখে স্থানীয় প্রেসক্লাব কিছুদিন বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুস সাদাত। শনিবার (২৮ মার্চ ২০২৬) সকালে প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি সাইফুল ইসলামকে ডেকে তিনি এ পরামর্শ দেন বলে জানা গেছে।
তবে ইউএনও নাজমুস সাদাত পরে বলেন, বিষয়টি তিনি ওইভাবে বলেননি। তাঁর দাবি, উভয় পক্ষই মীমাংসার জন্য সময় চেয়েছে এবং তারা নিজেরা সমাধান করলে সেটিই ভালো হবে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের তথ্য অনুযায়ী, গোদাগাড়ী প্রেসক্লাবটি ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০০৯ সালে উপজেলা সদরের ডাইংপাড়া মোড়ে একটি জায়গায় এক কক্ষের প্রেসক্লাব ভবন নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘদিন এই প্রেসক্লাবের সভাপতি ছিলেন আলমগীর কবির (তোতা)। সম্প্রতি ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জুলাই যোদ্ধা’ নামের সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয় যে আলমগীর কবির আওয়ামী লীগের দোসর ছিলেন। এ অভিযোগ সামনে এনে প্রেসক্লাব দখলের চেষ্টা চলছে বলে স্থানীয় সাংবাদিকেরা দাবি করেছেন।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সংগঠনটি প্রেসক্লাব ভবন দখল করে নিজেদের কার্যালয় করার চেষ্টা করছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. মুরশালিন গত মঙ্গলবার ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, প্রেসক্লাবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। ওই অভিযোগ দেওয়ার পরদিনই তাঁর নেতৃত্বে প্রেসক্লাবে তালা দেওয়া হয়। পরে সাংবাদিকেরা তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে সেখানে নিয়মিত বসতে পারছেন না। এ ঘটনায় সাংবাদিকেরা থানায় অভিযোগ করলেও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রেসক্লাবের সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় কয়েকজন সাংবাদিক প্রেসক্লাবে বসে ছিলেন। তখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির সাবেক সদস্যসচিব মো. রহমতুল্লাহসহ কয়েকজন সেখানে যান এবং জানান, প্রেসক্লাবের বিষয়ে ইউএনওর কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। সেই অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রেসক্লাব না খোলার কথা বলা হয়। এরপর থেকে নিরাপত্তা সংকটের কারণে সাংবাদিকেরা সেখানে বসতে পারছেন না।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জুলাই যোদ্ধার সভাপতি সাবিয়ার রহমান (মিল্টন) জানান, গণ–অভ্যুত্থানের পর থেকেই জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তিরা প্রেসক্লাব ভবনে নিজেদের কার্যালয় করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি কয়েক দফা সেই উদ্যোগ ঠেকানোর চেষ্টা করেছেন বলে জানান।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রেসক্লাব দখলের চেষ্টা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রেসক্লাবের সভাপতি সাইফুল ইসলাম। তাঁর দাবি, বর্তমানে সংগঠনটির কিছু সদস্য প্রেসক্লাব ভবন ভেঙে সেখানে পাবলিক টয়লেট অথবা যাত্রীছাউনি নির্মাণের কথাও বলেছেন। শনিবার সকালে ইউএনও তাঁকে ডেকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কিছুদিন প্রেসক্লাব বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজশাহী এডিটরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব (অপু)। তিনি বলেন, ‘প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের নিজস্ব নিয়মে চলে। এখানে যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপই স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। ইউএনও সরকারি কর্মকর্তা। তাই তাঁর এমন পরামর্শ সরকারকে নিয়ে ভুল বার্তাও ছড়াতে পারে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির সাবেক সদস্যসচিব মো. রহমতুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রেসক্লাব আছে সরকারি জায়গায়। সাংবাদিকেরা কেন সরকারি জায়গায় বসবে? অন্য কোনো জায়গায় প্রেসক্লাব করলে প্রয়োজনে আমি ভাড়া দেব। কিন্তু এই প্রেসক্লাব রাখব না।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, অতীতে এই প্রেসক্লাব থেকে নানা অনিয়ম হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এর আগেও বিভিন্ন সময়ে গোদাগাড়ী প্রেসক্লাবকে ঘিরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ২০১০ সালে একটি সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে উপজেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান আতাউর রহমান খানের নির্দেশে দলীয় কর্মীরা প্রেসক্লাবে তালা লাগিয়ে দেন। পরে সেটি আবার চালু হয়। ২০১৩ সালে একটি রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর নির্দেশে বুলডোজার দিয়ে ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। পরে সংস্কার করে প্রেসক্লাব পুনরায় চালু করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দিন প্রেসক্লাব ভবনে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। প্রায় ১৯ মাস বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি সংস্কার করে চলতি মাসেই প্রেসক্লাবটি আবার চালু করা হয়।
সিএ/এমই


