ঈদের মৌসুমে বগুড়ার সেমাইয়ের ব্যবসা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বিশেষ করে লাচ্ছা ও চিকন সেমাইয়ের খ্যাতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে। এই বছরও বগুড়ায় উৎপাদিত সেমাই রাজধানী ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বড় শহরে সরবরাহ করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন এবারের ঈদে বগুড়ার সেমাইয়ের বাজার মূল্য প্রায় এক হাজার কোটি টাকা হবে।
জেলা বেকারি মালিক সমিতি এবং বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি দ্রব্য প্রস্তুতকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বড় কারখানায় প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার কেজি লাচ্ছা সেমাই উৎপাদন হয়। দেড় মাসে একটি কারখানায় উৎপাদিত হয় প্রায় ১৩৫ মেট্রিকটন লাচ্ছা সেমাই। জেলায় বড় কারখানার সংখ্যা প্রায় ১৫০। তাই দেড় মাসে মোট উৎপাদন হয় ২০ হাজার ২৫০ মেট্রিকটন, যার বাজারমূল্য ৬০০ কোটি টাকার বেশি।
ছোট কারখানার সংখ্যা ৮৫০ এর কাছাকাছি। এ কারখানাগুলো দৈনিক গড়ে ৩০০ কেজি সেমাই উৎপাদন করে, যা দেড় মাসে প্রায় ১১ হাজার ৪৭৫ টন হয়। কেজি প্রতি ২০০ টাকা ধরা হলে, এ সেমাইয়ের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২৩০ কোটি টাকা। এছাড়া জেলায় চিকন ও ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা বিক্রি হয় আরও অন্তত ১০০ কোটি টাকার।
বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি সাইরুল ইসলাম বলেন, বগুড়ায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় হাজারখানেক সেমাই কারখানা রয়েছে। দুই ঈদে এসব কারখানায় উৎপাদিত লাচ্ছা ও চিকন সেমাই সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। সব মিলিয়ে বছরে গড়ে এক হাজার কোটি টাকার সেমাই ব্যবসা হয় বগুড়ায়।
বগুড়ার লাচ্ছা সেমাইয়ের খ্যাতি আসলে বহু দশক আগের। ত্রিশের দশকে ভারতের কলকাতার নাখোদা মসজিদ এলাকা থেকে সেমাই আনা হতো। চল্লিশের দশকে কলকাতা ও হুগলি থেকে নানা রঙের লাচ্ছা বগুড়ায় বিক্রি শুরু হয়। পরে কলকাতা থেকে কারিগর এনে বগুড়াতেই উৎপাদন শুরু হয়। পাম তেল ও সয়াবিন তেলে ভাজা লাচ্ছা পরবর্তীতে ডালডা ও ঘিয়েতে ভাজার প্রচলন করে আকবরিয়া বেকারি।
ষাটের দশকে বগুড়ার চিকন ও লাচ্ছা সেমাইয়ের খ্যাতি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। কাহালু উপজেলার শেখাহারে গড়ে ওঠা শতাধিক কারখানা ঈদ উৎসবে কয়েক হাজার টন লাচ্ছা সেমাই সরবরাহ করে দেশের বড় শহরে। আশির দশকে আকবরিয়া ও এশিয়া সুইটসের কারখানাগুলো সেমাই উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এশিয়া সুইটসের আবদুল কাদের বলেন, ১৪ বছর বয়সে তিনি এ কারখানায় কাজ শুরু করেন। বর্তমানে ১৫ জন কারিগরের সঙ্গে ডালডা ও ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা উৎপাদন করছেন। ডালডায় ভাজা লাচ্ছার দাম কেজিপ্রতি ৩০০ টাকা, আর ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছার দাম ১ হাজার ৩০০ টাকা। বাজারে অন্যান্য ব্র্যান্ডের দাম সামঞ্জস্যে বাড়িয়ে ৩০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
চিকন সেমাই বগুড়ায় চলে আসে চল্লিশের দশকে। ভারত ও পাকিস্তান থেকে কারিগররা বগুড়া শহরতলির চারমাথা-গোদারপাড়া এলাকায় তৈরি শুরু করেন। বেজোড়া গ্রামের দুলু মিয়া এই প্রথা শুরু করেন। বেজোড়া, ঘাটপাড়া, শ্যাঁওলাগাতি, কালসিমাটি, শ্যামবাড়িয়া, রবিবাড়িয়া ও আশপাশের ৮–১০ গ্রামের নারীদের হাতে প্রায় ৫০ বছর ধরে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু চিকন সেমাই। এই সেমাই বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
সিএ/এমই


