রাজশাহীর পদ্মা নদীতে দীর্ঘদিন পর জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরজমি এখন পরিণত হয়েছে সবুজ ফসলের মাঠে। প্রায় চার দশক আগে নদীভাঙনে হারানো জমি ফিরে পেয়ে নতুন করে আশার আলো দেখছেন কৃষকেরা। তবে এই সুখের মাঝেই নতুন শঙ্কা—আবার বালু উত্তোলন শুরু হলে সবকিছু নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়া, মনিগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় এখন যত দূর চোখ যায়, দেখা মিলছে বাদাম, গম ও বোরো ধানের ক্ষেত। কৃষকেরা বলছেন, নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ এবং বালু উত্তোলন বন্ধ থাকার কারণেই এই জমিগুলো আবার জেগে উঠেছে। এর ফলে দীর্ঘদিন পর অনেক পরিবারে স্বস্তি ফিরেছে।
নদীভাঙনে জমি হারিয়ে একসময় ঢাকায় গিয়ে পোশাক কারখানায় কাজ নেওয়া জহুরুল ইসলাম এখন আবার কৃষিকাজে ফিরেছেন। তিনি ৩০ বিঘা জমিতে বাদাম, ১৫ বিঘায় বোরো ধান এবং ৫ বিঘায় মটর চাষ করছেন। তাঁর মতো আরও অনেক কৃষক নতুন করে জমি ফিরে পেয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে হাঁটছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, ২০২১ সালে ‘রাজশাহী জেলার চারঘাট-বাঘা উপজেলার পদ্মা নদীর বাম তীরের স্থাপনাসমূহ নদী ভাঙন হতে রক্ষা প্রকল্প’ হাতে নেওয়া হয়। প্রায় ৭৪০ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের আওতায় ১২ কিলোমিটার নদী খনন এবং একাধিক বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি চলবে ২০২৬ সাল পর্যন্ত। এ সময় বালুমহালগুলো ইজারা বন্ধ রাখা হয়েছিল।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ইতিমধ্যে প্রায় ৩০০ হেক্টর জমি জেগে উঠেছে, যার একটি বড় অংশে এবার আবাদ হয়েছে। দীর্ঘদিন পর এই এলাকায় এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, যা স্থানীয়দের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা।
তবে সম্প্রতি বালুমহাল পুনরায় ইজারা দেওয়ার আলোচনা শুরু হওয়ায় উদ্বেগে পড়েছেন কৃষকেরা। তাঁরা আশঙ্কা করছেন, বালু উত্তোলন শুরু হলে আবার নদীভাঙন দেখা দেবে এবং এই ফসলি জমি হারিয়ে যাবে।
কৃষক ফজল মণ্ডল বলেন, ‘ধরেন এই যে আমরা বাদাম লাগাইছি, গম করিচি, লক্ষ লক্ষ বিঘা। এখন যদি আবার বালু কাটে, তাহলে এই জমি ভাইঙ্গি যাবি। আবার আমরা সেই কষ্টের মধ্যেই পইড়ব। গত বছর পাট বুনেছিনু দেড় বিঘা। ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হইচে। আবার যদি বালু কাটে, তাহলে আমারে মানিকগঞ্জ–ফরিদপুরে কামে যাতে হবি।’
একই ধরনের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইনছার আলীও। তিনি বলেন, ‘নদীত সব জমি ভাইঙ্গি গেল। জান বাঁচাতে অন্যের ভুঁইয়ে দিনমজুরি করেচি। ৪১ বছর পর আমার ১০ বিঘা জমি উটিচে। বোরো ধান লাগাইচি। আবার যদি বালু না কাটে, তাহলে আল্লাহর রহমতে আর পাইট (দিনমজুরি) দিয়ে খাতে হবে না।’
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, বালুমহাল চালু হলে আবার নিঃস্ব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই তারা বালু উত্তোলন বন্ধ রাখার দাবিতে প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছেন। গত বুধবার জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া আবেদনে চকরাজাপুর ও কিশোরপুর মৌজার বালুমহাল ইজারা না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, অতীতে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের কারণে এই এলাকাগুলো নদীগর্ভে বিলীন হয়েছিল। বর্তমানে যে ফসলি জমি তৈরি হয়েছে, তা প্রকল্পের সুফল। এই অবস্থায় পুনরায় বালু উত্তোলন শুরু হলে পুরো এলাকা আবার ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বালুমহাল ইজারা বন্ধ রাখা হয়েছিল। এখন কাজ শেষের দিকে, তাই বালুমহাল ইজারা দেওয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কৃষকদের আবেদন ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসনের মতামত চাওয়া হয়েছে। সেই মতামতের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি রক্ষায় বালু উত্তোলন বন্ধ রাখা জরুরি। তাঁদের মতে, কৃষির এই পুনর্জাগরণ টিকিয়ে রাখতে হলে নদী ব্যবস্থাপনায় সতর্ক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
সিএ/এমই


