কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার উত্তর হারবাং ইউনিয়নের ইছাছড়ি গ্রামে পাহাড়ি ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী একটি চক্রের নেতৃত্বে সশস্ত্র পাহারায় দিন-রাত বালু তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। এতে ছড়ার তীর ধসে পড়ছে, বদলে যাচ্ছে প্রাকৃতিক প্রবাহ এবং নষ্ট হচ্ছে আশপাশের ফসলি জমি।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুই–তিনজনের ছোট ছোট কয়েকটি দল লাঠি ও দা হাতে ছড়ার পাশে অবস্থান করছে। তাঁদের পাহারার মধ্যেই খননযন্ত্র বসিয়ে ছড়া ও আশপাশের জমি থেকে বালু তুলে ডাম্প ট্রাকে করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের উত্তর হারবাং পেট্রলপাম্প থেকে পূর্ব দিকে কাঁচা সড়ক ধরে প্রায় ৫০০ মিটার ভেতরে গেলেই ইছাছড়ি গ্রামের অবস্থান।
স্থানীয়দের দাবি, ছড়ার তলদেশ ও দুই তীরসহ বালুকাময় ফসলি জমিতে অন্তত সাতটি শ্যালো মেশিন ও ড্রেজার বসানো হয়েছে। প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক এ কাজে যুক্ত। আগে ছড়াটির প্রস্থ ছিল প্রায় ৬০ ফুট, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২০০ ফুটে দাঁড়িয়েছে। গভীরতাও ৫০ ফুটের বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা। বালু উত্তোলনের কারণে ছড়ার পাড় ভেঙে পড়ছে এবং ফসলি জমি কেটে পুকুরে রূপান্তরিত করা হয়েছে।
পাহারার কারণে পুরো কার্যক্রমের ছবি বা ভিডিও ধারণে বাধার অভিযোগ রয়েছে। পাহারায় থাকা নুরুল আমিন গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোকে বলেন, ‘নাজু ভাই (নাজিম উদ্দিন) ছাড়া আর কেউ এই মহালে ঢুকতে পারেন না, নিষেধ আছে। আপনারাও (সাংবাদিক) চলে যান ভালোয় ভালোয়। আমি কথা বাড়াতে চাই না।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, বালু উত্তোলনকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। ভিডিও বা ছবি তুলতে গেলে হামলার শিকার হতে হয়। গত ২২ ফেব্রুয়ারি বালু উত্তোলনের চিত্র ধারণ করতে গেলে চকরিয়ায় কর্মরত তিন সংবাদকর্মীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। তাঁদের পানিতে ডুবিয়ে হত্যাচেষ্টার পাশাপাশি মারধরের অভিযোগও ওঠে।
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ (সংশোধিত ২০২৩) অনুযায়ী পাহাড়ি এলাকায় সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল বা দেশীয় পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের বিধান রয়েছে। ড্রেজার, এক্সক্যাভেটর বা বোম্ব মেশিন ব্যবহার করে বালু তোলা সম্পূর্ণ অবৈধ। পাশাপাশি নির্ধারিত ইজারা এলাকার বাইরে বা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করে বালু উত্তোলন এবং নদীর পাড় ভেঙে বালু তোলা নিষিদ্ধ।
আহত সাংবাদিক ছোটন কান্তি নাথ প্রথম আলোকে বলেন, ইছাছড়ির চিহ্নিত অপরাধী নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বে শ্যালো মেশিন ও ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে ছড়ার তীর ধসে পড়ছে। ফসলি জমি কেটে পুকুর বানিয়ে ফেলা হয়েছে। কিছু অংশ ছড়ার সঙ্গে মিলিয়ে ২০০ ফুট প্রস্থের খাল বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবেদন তৈরি করতে সরেজমিনে সেখানে গেলে তিনি হামলার শিকার হন।
মূল অভিযুক্ত নাজিম উদ্দিনকে ২২ ফেব্রুয়ারির পর এলাকায় প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তাঁর মুঠোফোনেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে তিনি ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোকে বলেন, ইছাছড়ি গ্রামে বালু উত্তোলনের পর যখন পরিবহন করা হয়, তখন বালুমহালের ইজারাদার তাঁদের কাছ থেকে গাড়িপ্রতি টাকা (মহালের টাকা) নেন। সুতরাং এ কাজ বৈধ। বৈধভাবেই তাঁরা বালু তুলছেন।
ঘটনাস্থল থেকে বালু নিয়ে বের হওয়া চট্ট মেট্রো ছ-১১-৩৩৫৫ নম্বরের একটি ডাম্প ট্রাকের চালক আব্বাছ উদ্দিন জানান, ট্রাকপ্রতি ৪০০ টাকা ইজারা দিতে হয়। এ কারণে কাজটি বৈধ বলে তাঁরা মনে করেন।
যে মহাল থেকে বালু তোলা হচ্ছে, সেটি মুন্না এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ইজারা নেওয়া। প্রতিষ্ঠানের মালিক রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল নামের এক বিএনপি নেতাকে চুক্তি করে মহালটি উপ–ইজারা দিয়েছি। এখন সেখানে কী হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে আমি কিছুই জানি না।’
উপজেলা ভূমি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে উপ–ইজারার কোনো বিধান নেই। নজরুল ইসলাম আজ সকাল ১০টার দিকে নাজিম উদ্দিনের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করলেও ফসলি জমি কেটে ও ছড়ার পাড় ভেঙে বালু তোলার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
হারবাং ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা (তহশিলদার) মো. আবুল মনসুর বলেন, ‘ইজারার শর্ত লঙ্ঘন করে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে সরেজমিনে গিয়ে ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হয়েছে।’ চকরিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রূপায়ণ দেব বলেন, বালু উত্তোলনে উপ–ইজারার কোনো নিয়ম নেই। খুব শিগগিরই ইছাছড়ি গ্রামে অভিযান চালানো হবে।
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিন বলেন, সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, পরিবেশ ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছ
সিএ/এমই


