রমজান মাস এলেই বগুড়া শহরের বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল জামে মসজিদে দেখা যায় ভিন্ন এক দৃশ্য। ইফতারের প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে থেকেই মুসল্লিরা সারিবদ্ধভাবে বসে পড়েন। বারান্দাজুড়ে প্লেটে সাজানো থাকে নানা ধরনের ইফতার সামগ্রী। মাগরিবের সময় ঘনিয়ে এলে খাদেম ও স্বেচ্ছাসেবকেরা একে একে রোজাদারদের হাতে তুলে দেন ইফতারের প্লেট। একটি প্লেট ঘিরে চার থেকে পাঁচজন গোল হয়ে বসেন। অনেকেই একে অপরের অপরিচিত, কিন্তু ইফতারের সময় তাঁদের পরিচয় একটাই—রোজাদার মুসল্লি।
বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে এ মসজিদে প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ১০০০ মানুষ একসঙ্গে ইফতার করছেন। ধনী-গরিব, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একই প্লেটে ভাগাভাগি করে ইফতার করেন, যা সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইফতারের প্লেটে থাকে বিরিয়ানি বা খিচুড়ি, ছোলা, বুন্দিয়া, জিলাপি, খেজুর, মুড়ি, পেঁয়াজি, বেগুনি, তরমুজ ও শরবত। আসরের নামাজের পর থেকেই স্বেচ্ছাসেবকেরা প্লেট সাজানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ইফতারের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এসব প্লেট মুসল্লিদের মাঝে বিতরণ করা হয়।
রিকশাচালক নুরুল ইসলাম (৭০) ইফতারের আগে রিকশা রেখে এসে বসেন মসজিদের বারান্দায়। আজানের সঙ্গে সঙ্গে তিনি, ব্যবসায়ী কামাল আহমেদ (৫৫), অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা দীন মোহাম্মদ (৬৫), দোকান কর্মচারী আবদুল মান্নান (৩৫), দিনমজুর জানে আলম (৬৫) ও শিক্ষার্থী রাব্বী হাসান (২২) একসঙ্গে ইফতার শুরু করেন। তাঁরা একে অপরকে না চিনলেও একই প্লেটে ভাগাভাগি করে ইফতার করেন।
মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ২০০৮ সালে মসজিদে নামাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই রমজানে একসঙ্গে ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছে। মুসল্লি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অনুদানে এ উদ্যোগ চালু রয়েছে। এতে রোজাদারদের সেবা দেওয়ার পাশাপাশি সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের বার্তাও ছড়িয়ে পড়ছে।
মসজিদের খাদেম মো. রবিউল ইসলাম জানান, প্রতিদিন গড়ে এক হাজার মানুষের জন্য ইফতার প্রস্তুত করা হয়। খিচুড়ি রান্নায় এক থেকে সোয়া মণ সুগন্ধি চাল ও এক মণ সবজি লাগে। সপ্তাহে দুদিন ১৫ থেকে ২০ কেজি গরুর মাংস দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করা হয়। রান্নার জন্য বাবুর্চি নিয়োজিত থাকেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মুসল্লিদের অনুদানে এবার প্রায় চার লাখ টাকা তহবিলে জমা হয়েছে।
খাদেম আবদুল করিম বলেন, মাসজুড়ে ইফতার আয়োজন চললেও অন্তত ১০ দিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, অঙ্গসংগঠন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইফতার দেওয়া হয়। বাকি দিনগুলোতে মসজিদ কমিটির ব্যবস্থাপনায় আয়োজন হয়। মুসাফির, শ্রমজীবী ও ভিক্ষুকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন।
ইফতার করতে আসা রিকশাচালক নবীর উদ্দিন বলেন, ‘রোজা ছিলাম। একই প্লেটে বিরিয়ানিসহ ইফতার খেয়েছি। পেট ভরেছে। রাতে শুধু সাহরি খাবো।’ শিক্ষার্থী মুনতাসির রাফি বলেন, ‘মেসে থাকি। প্রতিদিন মেসের সবাই এ মসজিদে ইফতার করতে আসি। এখানে এক প্লেটে চার-পাঁচজন ভাগাভাগি করে ইফতার করার অনুভূতি অন্যরকম। ধনী-গরিবের ভেদাভেদ নেই। এটা শুধু এক সঙ্গে ইফতার নয়; পারস্পরিক সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ।’
মসজিদ কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, মসজিদটি নির্মাণ করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ তিনি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং গত ৩০ জানুয়ারি এখানে জুমার নামাজ আদায় করেন।
সিএ/এমই


