বরিশালে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এজলাসে হট্টগোল ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার জামিন মঞ্জুরকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার ( ৫ ডিসেম্বর) দুপুরে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা আদালত কক্ষে ঢুকে বেঞ্চে ধাক্কা দেন এবং উচ্চস্বরে প্রতিবাদ জানান বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটির সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
আদালত–সংশ্লিষ্ট সূত্র ও কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মঙ্গলবার বেলা ২টা ৩৯ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডের দিকে এ ঘটনার সূচনা হয়। এর আগে আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন দেওয়ার প্রতিবাদে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা চিফ মেট্রোপলিটন আদালত ও অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেন। তাঁরা চিফ মেট্রোপলিটন আদালত চত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভও করেন।
১ মিনিট ৪১ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরীয়তউল্লাহ একটি মামলার শুনানি করছিলেন। এ সময় আদালতে কোার্ট রেজিস্ট্রার ও তিনজন কনস্টেবল উপস্থিত ছিলেন। শুনানির মধ্যে হঠাৎ আদালত কক্ষের ভেজানো দরজা খুলে একজন আইনজীবী চিৎকার করতে করতে এজলাসে প্রবেশ করেন। তাঁর পেছনে আরও কয়েকজন আইনজীবী ঢুকে পড়েন। তাঁরা এজলাসের বেঞ্চে হাত ও পা দিয়ে ধাক্কা দেন। একজন আইনজীবী বিচারকের সামনে গিয়ে আঙুল তুলে উচ্চস্বরে কথা বলেন এবং সামনে থাকা একটি বেঞ্চে আঘাত করেন। কিছুক্ষণ পর তাঁরা আদালত কক্ষ ত্যাগ করেন।
আইনজীবীদের একটি সূত্রের দাবি, প্রথমে এজলাসে প্রবেশ করেন বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান (লিংকন)। মঙ্গলবার রাতে তিনি বলেন, ‘৩০-৪০ লাখ টাকা নিয়ে জামিন দেওয়া হয়েছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের বিচারক আমাদের জানিয়েছেন যে তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুসকে জামিন দেওয়া হবে। আমি বললাম, আপনি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে আমরা কী বলব? আমরা তাঁকে জামিন না দিতে অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি জামিন দিয়ে দেন। এ ঘটনায় আমরা আজ সকালে কোর্ট না চালানোর অনুরোধ করলেও কাজ হয়নি। পরে বিক্ষুব্ধ আইনজীবীরা কোর্টে ঢুকে প্রতিবাদ জানান। এ সময় বেঞ্চ ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরে এই ঘটনা নিয়ে মহানগর দায়রা জজের সঙ্গে কথা হয়। তিনি আমাদের কথা শোনেন। বিষয়টি মিটমাট হয়ে যায়। আমরা আগামীকাল (বুধবার) জামিন বাতিলের আবেদন দেব। দেখি উনি (বিচারক) কী করেন। তারপর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব আহমেদ বলেন, ‘আদালতে যে ঘটনা ঘটেছে, এ নিয়ে মহানগর দায়রা জজের সঙ্গে বিচারকদের আলোচনা চলছে। আমি এ বিষয়ে আর বলতে পারব না।’
এজলাসে ঘটনার আগে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা বিচারক এস এম শরিয়ত উল্লাহকে অপসারণ এবং সংশ্লিষ্ট জামিন আদেশ বাতিলের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য মহানগরের সব আদালত বর্জনের ঘোষণা দেন। বিক্ষোভ কর্মসূচিতে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের পিপি মোস্তাফিজুর রহমান (বাবু), এপিপি সাইদ মোর্শেদ মামুন, অতিরিক্ত পিপি আবুল কালাম আজাদ (ইমন), অতিরিক্ত পিপি নুরুল হক (দুলাল) প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
জেলা জজ আদালতের সহকারী সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) ও জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক হাফিজ আহমেদ (বাবলু) বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতা তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুসের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি জামিন অযোগ্য। তিনি আত্মসমর্পণ করলে বিচারক রহস্যজনক কারণে জামিন দেন। এ ছাড়া আরও কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা এই আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন, যা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এসব জামিন দেওয়া হয়েছে। আমরা জামিনের বিরোধিতা করলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে।’
তবে আদালত কক্ষে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমরা দুপুরে কর্মসূচি শেষ করার পর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকন ও মহানগরের দুজন সরকারি কৌঁসুলি গতকাল সোমবার আওয়ামী লীগ নেতা তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুসের জামিন আদেশ বাতিলের জন্য ওই আদালতে একটি আবেদন নিয়ে যান। কিন্তু আবেদনটি না রেখে তাঁদের অপমানজনক কথা বলেন বিচারক। এ নিয়ে সামান্য বাগ্বিতণ্ডা হয়েছে। আদালতে হামলার কোনো ঘটনা ঘটেনি।’
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বরিশাল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস সোমবার (৬ ডিসেম্বর) আদালতে আত্মসমর্পণের পর জামিন পান। তাঁর জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরীয়তউল্লাহ।
এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজসহ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের তিন নেতা জামিনে মুক্তি পান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বরিশাল সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন এবং বরিশাল মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হক খান।
সিএ/এমই


