ময়মনসিংহের ১১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে আটটিতে জয় পেলেও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে পরাজিত হয়েছে বিএনপি। দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহসহ ধানের শীষের প্রার্থীদের এ পরাজয় ঘিরে দলীয় নেতাদের মধ্যে চলছে বিশ্লেষণ। বিদ্রোহী প্রার্থীর অংশগ্রহণ, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট–পরবর্তী সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া—এসব কারণকে সামনে আনছেন নেতারা।
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া), ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) ও ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসনে ধানের শীষের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। তিনটি আসনেই ফলাফলে বিদ্রোহী বা শরিক প্রার্থীদের প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে।
ময়মনসিংহ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ। মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন হালুয়াঘাট উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সালমান ওমর। প্রার্থী হওয়ার পর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। নির্বাচনের ফলাফলে সালমান ওমর ১ লাখ ৭ হাজার ২৪১ ভোট পেয়ে জয়ী হন। ধানের শীষের প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ পান ১ লাখ ৭৩৬ ভোট।
স্থানীয়দের দাবি, নির্বাচনের আগে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমরের এক কর্মীকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা এবং বিএনপির কিছু কর্মীর বিরুদ্ধে নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলেছে। ফলে ধানের শীষের পক্ষে জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও তা ভোটে প্রতিফলিত হয়নি বলে অনেকে মনে করছেন।
শনিবার (৬ ডিসেম্বর) দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে সৈয়দ এমরান সালেহ বলেন, ‘নির্বাচনে জনগণ ও ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনের যে ফলাফল তাতে আমার প্রতীয়মান হয়েছে, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ও সূক্ষ্ম কারচুপির মাধ্যমে ফলাফলকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি এই ফলাফলকে প্রত্যাখ্যান করছি।’ তিনি নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও তোলেন।
ময়মনসিংহ-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার। তিনি ১ লাখ ১৭ হাজার ৩৪৪ ভোট পান। ১১-দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহাম্মদুল্লাহ ১ লাখ ৪৪ হাজার ৫৬৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন।
এ আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শাহ শহীদ সারোয়ার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ৪৮ হাজার ৮৭৪ ভোট পান। দলীয় সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, সাবেক এমপির স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া এবং কিছু কর্মীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ধানের শীষের ভোটে প্রভাব ফেলেছে।
ময়মনসিংহ-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. আখতারুল আলম ৪৯ হাজার ৪৭৬ ভোট পেয়ে চতুর্থ হন। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী কামরুল হাসান ৭৫ হাজার ৯৪৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আখতার সুলতানা, যিনি পান ৫২ হাজার ৬৬৯ ভোট। আখতার সুলতানা সম্পর্কে জানা গেছে, তিনি ধানের শীষের প্রার্থী আখতারুল আলমের চাচি। পারিবারিক ও রাজনৈতিক বিভাজন ভোটে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
সংবাদ সম্মেলনে আখতারুল আলম বলেন, ‘আমরা শুরু থেকে প্রশাসনের কোনো সহযোগিতা পাইনি। নির্বাচনের দিন বিভিন্ন এলাকায় আমাদের কর্মীদের প্রশাসন মারধর করেছে। প্রশাসন একটি বিশেষ দলকে বিজয়ী করতে কাজ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আশা করছি আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিএনপিকে শক্তিশালী করব এবং সামনের নির্বাচনে বিজয়ী হব।’
উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এনায়েত উল্লাহ বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থীদের সক্রিয় ভূমিকা তিন আসনেই পরাজয়ের বড় কারণ। তিনি দাবি করেন, কিছু ক্ষেত্রে ভোট গণনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ময়মনসিংহ-২ আসনে সাবেক এমপির স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়াও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে তাঁর মত।
দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব রোকনুজ্জামান সরকার বলেন, ময়মনসিংহ-৬ আসনে দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ের কারণ খতিয়ে দেখা হবে। তিনি বলেন, জনগণ যাকে উপযুক্ত মনে করেছেন, তাঁকেই ভোট দিয়েছেন। কোথায় সাংগঠনিক দুর্বলতা ছিল, তা তদন্ত করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
সিএ/এমই


