ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালালেও প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটি ২৫৩টি আসনে প্রার্থী দিলেও জয় পেয়েছে মাত্র একটিতে। অধিকাংশ আসনেই উল্লেখযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেনি তারা। নির্বাচনে অংশ নিয়েও পরাজিত হয়েছেন চরমোনাই পীর ও দলের আমির সৈয়দ রেজাউল করীমের তিন ভাই।
দলের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ ফয়জুল করীম বরিশাল-৫ (সদর-সিটি করপোরেশন) আসনে দ্বিতীয় হলেও বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন। বরিশাল-৫ আসনে তিনি পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫২৮ ভোট। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার ১ লাখ ৩১ হাজার ৪৩১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন।
বরিশাল-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন খান ৮১ হাজার ৮৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মো. মাহমুদুন্নবী পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৫৩৩ ভোট। সেখানে হাতপাখা প্রতীকে সৈয়দ ফয়জুল করীম পেয়েছেন ২৮ হাজার ৮২৩ ভোট।
বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে প্রার্থী ছিলেন চরমোনাই পীরের আরেক ভাই সৈয়দ ইছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের। তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব এবং বাংলাদেশ কোরআন শিক্ষা বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান। এ আসনে তিনি পেয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫৩ ভোট। একই আসনে বিএনপির প্রার্থী রাজীব আহসান পেয়েছেন ১ লাখ ২৮ হাজার ৩২২ ভোট এবং জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল জব্বার পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৬৮৪ ভোট।
ঢাকা-৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন পীরের আরেক ভাই মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ। তিনি ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং চরমোনাই আহছানাবাদ রশীদিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। এ আসনে মোট ভোট পড়েছে ৪৫ শতাংশ। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ৭৭ হাজার ৩৬৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী তানভীর আহমেদ পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৪৪৭ ভোট। হাতপাখা প্রতীকে মোসাদ্দেক বিল্লাহ পেয়েছেন ৬ হাজার ৫১৮ ভোট। এতে তাঁর জামানতও রক্ষা হয়নি।
ভোটের ফল ঘোষণার পর সৈয়দ ফয়জুল করীম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বরিশাল-৫ আসনে নিজের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা উল্লেখ করে সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এবারের নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের কয়েকটি আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা আলোচনায় ছিলেন। পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনে সাবেক সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী দলটিতে যোগ দিয়ে প্রার্থী হন। পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনে বিএনপি থেকে যোগ দেওয়া সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান প্রার্থী হন। বরগুনা-1 (সদর-আমতলী-তালতলী) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মাওলানা অলি উল্লাহ। তবে বরগুনা-১ আসনে অলি উল্লাহ ছাড়া অন্য সবাই পরাজিত হয়েছেন।
পটুয়াখালী-৪ আসনে বিএনপির এ বি এম মোশাররফ হোসেন ১ লাখ ২৪ হাজার ১৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন। মোস্তাফিজুর রহমান পান ৭০ হাজার ১২৭ ভোট। পিরোজপুর-৩ আসনে বিএনপির রুহুল আমীন দুলাল ৬৩ হাজার ৭৯১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। সেখানে এনসিপির প্রার্থী শামীম হামিদী (শাপলা কলি) ৩৬ হাজার ৬১৬ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় এবং রুস্তম আলী ফরাজী (হাতপাখা) ৩৫ হাজার ৯৬৮ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন।
১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পেল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
বরিশালের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, মাঠপর্যায়ের প্রচারে সক্রিয় থাকলেও ভোটে তার প্রতিফলন ঘটেনি। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের জোট ভেঙে যাওয়ায় দুই দলের ভোট ভাগ হয়ে গেছে, যার বড় সুবিধা পেয়েছে বিএনপি।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বরিশাল নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, দেশে চরমোনাই দরবারের সামাজিক প্রভাব রয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ধর্মীয় ও সামাজিক পরিসরে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা ও উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। তবে এই প্রভাব এখনো কার্যকর ভোটব্যাংকে রূপ নিতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, ইসলামী আন্দোলনের ভোটভিত্তি এখনো সীমিত পরিসরেই রয়ে গেছে। তার ওপর বিএনপি ও জামায়াতের মতো সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এই সীমিত ভোটব্যাংক নিয়ে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি তরুণ ও শহরের ভোটারদের সঙ্গে দলটির রাজনৈতিক ভাষা ও আবেগপ্রবণ সংযোগ এখনো দৃঢ়ভাবে তৈরি হয়নি, যা সংসদীয় রাজনীতিতে বড় পরিসরে সমর্থন অর্জনের ক্ষেত্রে একটি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে কাজ করছে।
সিএ/এমই


