আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সীমান্তঘেঁষা জেলা লালমনিরহাটে বইছে উৎসবের হাওয়া। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে হাট-বাজার—সর্বত্রই এখন আলোচনার কেন্দ্রে কে পাচ্ছেন জনরায়। তবে এই উৎসবের আবহে একটি রূঢ় বাস্তবতা আড়াল হয়ে যাচ্ছে লালমনিরহাটের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জেলার প্রায় অর্ধেক ভোটারের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নিরাপত্তা আজও চরম অবহেলার শিকার।
সরকারি ভোটার তালিকার তথ্য অনুযায়ী, লালমনিরহাটের তিনটি আসনে মোট ভোটারের ৪৯.৮৪ শতাংশই নারী। অর্থাৎ, লালমনিরহাট-১, ২ ও ৩ আসনে জয়-পরাজয়ের মূল চাবিকাঠি নারীদের হাতেই। বিশেষ করে লালমনিরহাট-৩ আসনে নারী ও পুরুষ ভোটারের ব্যবধান মাত্র ০.০৬ শতাংশ। কিন্তু পরিসংখ্যানের এই শক্ত অবস্থান রাজনীতির মাঠে প্রতিফলিত হচ্ছে না। জেলার তিনটি সংসদীয় আসনের কোনোটিতেই এবার মূলধারার কোনো রাজনৈতিক দল থেকে নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।
লালমনিরহাট জেলার নির্বাচনী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনটি সংসদীয় আসনেই নারী ভোটারদের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। লালমনিরহাট-১ (পাটগ্রাম-হাতীবান্ধা) আসনে ৪,০৩,৫৬১ জন ভোটারের মধ্যে নারী ভোটার ২,০০,৮৫২ জন (৪৯.৭৭%)। লালমনিরহাট-২ (কালীগঞ্জ-আদিতমারী) আসনে মোট ভোটার ৪,৩২,৯৬৪ জন, যার মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ২,১৫,৭৬১ জন (৪৯.৮৩%)। তবে সবচেয়ে হাড্ডাহাড্ডি অবস্থা লালমনিরহাট-৩ (সদর) আসনে, যেখানে ৩,০৭,৯৭০ জন ভোটারের মধ্যে ১,৫৩,৮০১ জনই নারী; অর্থাৎ এখানে নারী ভোটারের হার প্রায় অর্ধেক বা ৪৯.৯৪%।
নির্বাচনী প্রচারণায় নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও তাদের জন্য কোনো অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হয়নি। হাতীবান্ধাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রচারণা চলাকালে নারী কর্মীদের হয়রানি ও হেনস্তার বিচ্ছিন্ন খবর পাওয়া যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে তল্লাশি বা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নারী পুলিশ বা নারী কর্মকর্তার তীব্র সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ সদস্যদের দ্বারা নারী কর্মীদের দেহ তল্লাশির মতো ঘটনা তাদের জন্য অবমাননাকর ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করছে।
এছাড়া, নারীদের জন্য আলাদা কোনো প্রচারণা কাঠামো বা সময়সীমা নির্ধারণ না করায় সামাজিক ও পারিবারিক সীমাবদ্ধতার মাঝে নারী কর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলগুলো নারী ভোট ব্যাংক ব্যবহার করতে মরিয়া হলেও নেতৃত্বে নারীদের তুলে আনতে চরম অনীহা দেখাচ্ছে।
লালমনিরহাটের সুশীল সমাজ ও নারী অধিকারকর্মী শান্তি বালার মতে, কেবল ভোটার হিসেবে নারীদের ব্যবহার করা গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। আমাদের দাবিগুলো হলো বিশেষ নিরাপত্তা স্কোয়াড নির্বাচনী মাঠে নারী কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ টিম গঠন। নারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি প্রতিটি ভোটকেন্দ্র এবং তল্লাশি চৌকিতে পর্যাপ্ত নারী পুলিশ ও পোলিং অফিসার নিয়োগ। আইনি বাধ্যবাধকতা রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় কমিটিতে এবং প্রার্থী মনোনয়নে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের কঠোর অবস্থান।
গণতন্ত্রের উৎস হলো ভোট, আর লালমনিরহাটের অর্ধেক শক্তিই হলো নারী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে নেতৃত্বের বাইরে রেখে বা তাদের মর্যাদাকে তুচ্ছ করে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব নয়। হাতীবান্ধার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, নারীবান্ধব নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতে আমরা কতটা পিছিয়ে। লালমনিরহাটের সচেতন ভোটাররা এখন তাকিয়ে আছেন নির্বাচন কমিশনের দিকে—তারা কি পারবেন একটি বৈষম্যহীন ও নিরাপদ নির্বাচনী পরিবেশ উপহার দিতে?
সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
সিএ/জেএইচ


