জামায়াত নেতার নির্দেশে ‘ভোটের সিল’ তৈরি, আদালতে স্বীকারোক্তি প্রিন্টিং প্রেস মালিকের
লক্ষ্মীপুরে অবৈধভাবে ভোটের ছয়টি সিল উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া একটি প্রিন্টিং প্রেসের মালিক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বুধবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে সিল তৈরির নির্দেশদাতার নাম প্রকাশ করেন।
স্বীকারোক্তি দেওয়া ওই ব্যক্তির নাম সোহেল রানা (৪০)। তিনি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার টুমচর ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং শহরের পুরোনো আদালত রোডে অবস্থিত মারইয়াম প্রেসের স্বত্বাধিকারী। পুলিশ জানায়, গত মঙ্গলবার বিকেলে ওই প্রেসে অভিযান চালিয়ে ভোটে ব্যবহারের অবৈধ ছয়টি সিল, একটি কম্পিউটার ও একটি মুঠোফোনসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওয়াহেদ পারভেজ বলেন, সোহেল রানা আদালতে জানিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতা সৌরভ হোসেন ওরফে শরীফের নির্দেশে এসব সিল তৈরি করা হয়েছে। গত ৩০ জানুয়ারি শরীফ তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে সিল তৈরির অর্ডার দেন এবং সেই অনুযায়ী সিলগুলো বানানো হয়।
স্বীকারোক্তিতে উল্লেখ করা সৌরভ হোসেন ওরফে শরীফ (৩৪) লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. শাহজাহানের ছেলে। তিনি ওই ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি ছিলেন। ঘটনার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ঘটনার পর সৌরভ হোসেনকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে এ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেলা জামায়াতের আমির এস ইউ এম রুহুল আমিন ভূঁইয়া বলেন, ঘটনার পরপরই সৌরভকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ভোটারদের ‘ভোট দেওয়া শেখানোর’ উদ্দেশ্যে নাকি সিলগুলো তৈরি করা হয়েছিল, তবে এটিকে দায়িত্বহীন কাজ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যাঁর দোকান থেকে সিল উদ্ধার হয়েছে, তিনি জামায়াতের কেউ নন।
এদিকে এ ঘটনার পর মঙ্গলবারই লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সংবাদ সম্মেলন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘সিলসহ সোহেল রানা নামে যাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তিনি জামায়াতের কর্মী বলে জানতে পেরেছি। হয়তো তাঁর পদ-পদবিও আছে। একটি কম্পিউটারসহ ছয়টি সিল জব্দ করা হয়েছে। সিলগুলো যিনি বা যাঁরা বানিয়েছেন, নিশ্চয়ই এর পেছনে অনেক কলকবজা আছে, একটা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের হিসাব-নিকাশ আছে।’
এর জবাবে একই দিন রাত ১০টার দিকে লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতে ইসলামী। সেখানে লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী রেজাউল করিম বলেন, ‘ভোটের সিলসহ গ্রেপ্তার ব্যক্তির সঙ্গে জামায়াতকে জড়িয়ে বিএনপি মিথ্যাচার করছে।’
পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, উদ্ধার হওয়া সিলের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে দুটি দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে—প্রথমত, এসব সিল ভোটারদের প্রশিক্ষণ বা মহড়ার কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল কি না। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের দিন ব্যালট পেপারে সিল মারার মাধ্যমে ভোট কারচুপি বা অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল কি না।
লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওয়াহেদ পারভেজ বলেন, স্বীকারোক্তির পর সিল তৈরির পেছনের উদ্দেশ্য এবং এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে জব্দ করা আলামতগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সিএ/এমই


