রাজধানীর ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেই ফুটপাতে বসে চলছে এক মায়ের লড়াই। গুলশান-২ নম্বর এলাকার এক ফুটপাতে সাদাছড়ি হাতে বসে থাকেন জ্যোৎস্না বেগম। তাঁর পাশে তিন মেয়ে—নুসরাত জাহান, ইশরাত জাহান ও তাবাসসুম আক্তার। বড় মেয়ে নুসরাত ফুটপাতেই বসে ছোট বোনকে পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছে। সীমাহীন অভাবের মধ্যেও শিক্ষা থেকে সরে আসেনি এই পরিবার।
জ্যোৎস্না বেগম জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। স্বামী অটোরিকশা চালাতেন, তবে তাঁরও শারীরিক সমস্যা ছিল। প্রায় ১০ মাস আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান তিনি। এরপর থেকেই সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে জ্যোৎস্নার কাঁধে। আগে মাঝে মাঝে ফুটপাতে বসতেন, এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেখানেই সময় কাটে তাঁর। পথচারীদের সহায়তায়ই চলছে সংসার।
পাঁচ বছর ধরে কড়াইল বস্তিতে বসবাস করছেন জ্যোৎস্না। মাসে চার হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয় ঘরের জন্য। বড় মেয়ে নুসরাত ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে তাবাসসুম তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে বনানীর একটি কমিউনিটি স্কুলে, যেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ রয়েছে। তারা বিনামূল্যে বইপত্র ও টিফিনও পায়। মেজ মেয়ে ইশরাত আরেকটি বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত স্কুলে পড়াশোনা করছে। তবে তিন মেয়ের প্রাইভেট পড়াশোনার জন্য প্রতি মাসে প্রায় আট হাজার টাকা খরচ হয়।
জ্যোৎস্না বেগম বলেন, স্বামী বেঁচে থাকতে সংসারের খরচ সামাল দেওয়া তুলনামূলক সহজ ছিল। এখন মানুষের দান-সহায়তার ওপর নির্ভর করে এই ব্যয় চালানো বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে। তবু মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করার কথা তিনি ভাবেন না। তাঁর কথায়, মেয়েরা লেখাপড়ায় ভালো এবং তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নই তাঁকে টিকিয়ে রেখেছে।
স্কুল বন্ধ থাকলে মেয়েদের সঙ্গে নিয়েই ফুটপাতে বসেন জ্যোৎস্না। তবে কাউকে সাহায্য চাইতে মেয়েদের উৎসাহ দেন না। তারা মায়ের পাশে বসে পড়াশোনা করে সময় কাটায়। রোজার সময় পাশের একটি প্রতিষ্ঠানের ইফতারি দিয়ে অনেক সময় তাঁদের খাবারের ব্যবস্থা হয়।
জ্যোৎস্না বলেন, ‘আমি হাত পাতি মানুষের কাছে। অনেক ম্যাডাম ও স্যার মাঝে মাঝে ৫০০ বা ১০০০ টাকাও দেন। এই টাকাগুলা খরচ করি না। জমায় রাখি। দুই দিন রান্না করি, দুই দিন করি না। এক বেলা খাইলে আরেক বেলা খাই না। মাথায় খালি চিন্তা থাকে, মেয়েদের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়।’
পারিবারিক সহায়তা থেকেও বঞ্চিত এই নারী। তাঁর বাবার বাড়ি জয়পুরহাটে এবং স্বামীর বাড়ি ঝিনাইদহে হলেও দুই পরিবারের আর্থিক অবস্থা দুর্বল। ফলে তাঁদের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে।
মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগে থাকেন জ্যোৎস্না। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের একা রেখে যাওয়ার সাহস পান না বলেই বেশির ভাগ সময় সঙ্গে রাখেন। মেয়েরা একাই স্কুলে যাতায়াত করে, আর তিনি তাদের প্রয়োজনীয় সতর্কতা বুঝিয়ে দেন।
বস্তির ঘরের মালিকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জ্যোৎস্না জানান, সময়মতো ভাড়া দিতে না পারলেও তিনি তা মেনে নেন। এই সহানুভূতি না থাকলে ঢাকায় টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে যেত।
স্বামীর স্মৃতিও তাঁর জীবনের বড় শক্তি। তিনি বলেন, স্বামী বিভিন্ন কাজে তাঁকে সহায়তা করতেন এবং ভালো মানুষ ছিলেন। সেই স্মৃতিই এখন তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহস জোগায়।
দিন শেষে বাড়ি ফিরতেও সংগ্রাম করতে হয় তাঁকে। রাতে ফিরতে দেরি হলে ৫০ টাকা রিকশা ভাড়া লাগে। এই টাকাও বাঁচাতে অনেক সময় হেঁটেই ফিরতে হয়। কারণ, সামান্য এই সঞ্চয়ই তাঁর কাছে বড় সহায়তা।
সিএ/এমই


