ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে গ্যাসলাইটার তৈরির একটি কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে মীম আক্তার (১৬) নামে এক কিশোরীর লাশ শনাক্ত করেছেন তার বাবা। শনিবার (৬ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় মিটফোর্ড মর্গে মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করার পর শোকে ভেঙে পড়েন তিনি।
মীমের বাবা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আগুন লাগার খবর পেয়ে আমি কারখানার সামনে ছুটে যাই। মেয়েকে উদ্ধারের জন্য ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করি, কিন্তু গেট বন্ধ ছিল। বাইরে দাঁড়িয়ে কারখানা পুড়তে দেখেছি। আমার একমাত্র সন্তান আমাকে ছেড়ে চলে গেল।’ তিন বছর আগে তার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর মীমই ছিল তার একমাত্র ভরসা।
শনিবার দুপুরে কদমতলীর আমবাগিচা এলাকায় টিনশেডের ওই কারখানায় আগুন লাগে। এতে মীমসহ ছয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে চারজনের মরদেহ এতটাই পুড়ে গেছে যে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এমনকি তারা নারী না পুরুষ তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মরদেহগুলো ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এ ঘটনায় আরও কয়েকজন শ্রমিক দগ্ধ হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজনকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, মো. জিসানের শরীরের ২২ শতাংশ এবং মো. আসিফের ১৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।
বেঁচে ফেরা শ্রমিকদের অভিযোগ, আগুন লাগার সময় কারখানার প্রধান ফটক বন্ধ ছিল। ফলে শ্রমিকরা দ্রুত বের হতে পারেননি। তারা জানান, ভেতরে আগুন ছড়িয়ে পড়ার সময় সবাই চিৎকার করছিলেন এবং বিকল্প পথ খুঁজছিলেন। কিছু সময় পর ফটক খোলা হলে কয়েকজন বের হতে সক্ষম হন।
দেলোয়ার হোসেন জানান, তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। পরিবারের আর্থিক কষ্টের কারণে পাঁচ মাস আগে মেয়েকে ওই কারখানায় কাজে দেন। তিনি বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। একার আয়ে সংসার চালানো কঠিন ছিল। তাই মেয়েকে কাজে দিয়েছিলাম। কাজে না দিলে আজ তাকে হারাতে হতো না।’
অগ্নিকাণ্ডে বেঁচে যাওয়া ১২ বছর বয়সী এক কিশোরী জানায়, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে সে বের হওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু গেট বন্ধ পায়। কিছুক্ষণ পর বাইরে থেকে গেট খোলা হলে সে বের হতে পারে। আট মাস ধরে সে ওই কারখানায় কাজ করছিল।
ঘটনার পর স্বজনরা মিটফোর্ড মর্গে ভিড় করেন। অনেকেই নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে না পেয়ে উদ্বেগে রয়েছেন। শাহিনুর ও মঞ্জু বেগম নামে দুই শ্রমিক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তাদের স্বজনরা।
স্থানীয়দের মতে, কারখানার ভেতরে দাহ্য গ্যাস ও রাসায়নিক পদার্থ মজুত থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। টিনশেডের এই কারখানায় কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, দুপুর ১টা ১১ মিনিটে আগুন লাগার খবর পেয়ে সাতটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং বিকেল পৌনে ৫টার দিকে তা পুরোপুরি নিভে যায়। পরে তল্লাশি চালিয়ে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি জানান, অজ্ঞাত পরিচয়ে মরদেহগুলো মর্গে রাখা হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার পর সেগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে নিহত ও আহতদের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
সিএ/এএ


