চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে (ডিএফপি) চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ওপর হামলার ঘটনায় বিচার দাবি এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ৬ দফা দাবি জানিয়েছে কালচারাল অ্যান্ড ফিল্ম কালেকটিভ। শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম, নির্মাতা ও ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট ঋতু সাত্তার, গবেষক রেজাউর রহমান লেনিনসহ হামলায় আহত সংস্কৃতিকর্মী মোশফিকুর রহমান জোহান ও গোলাপ শাহ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি অঙ্গনের আরও অনেকেই সংহতি জানাতে অংশ নেন।
বক্তারা অভিযোগ করেন, গত ৩০ মার্চ তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিএফপিতে জুলাই আন্দোলনভিত্তিক তথ্যচিত্রের বকেয়া বিল নিতে গেলে নির্মাতাদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, অধিদপ্তরের চিত্রগ্রাহক পদে কর্মরত মো. মশিউর রহমান বকেয়া বিল পরিশোধে বাধা দেন এবং পরে বহিরাগত ৩০-৪০ জনকে ডেকে এনে হামলার ঘটনা ঘটান। এতে গোলাপ শাহসহ কয়েকজন গুরুতর আহত হন।
আহত গোলাপ শাহ বলেন, আমরা বিগত সময়ে রাষ্ট্রকে এক ভয়ংকর রূপ নিতে দেখেছি। সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, তার জন্য এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার জরুরি।
ঋতু সাত্তার বলেন, এটি শুধু কয়েকজন নির্মাতার ওপর হামলা নয়; পুরো সাংস্কৃতিক বলয়ের ওপর আঘাত। একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এ ধরনের ঘটনা ঘটায় প্রতিষ্ঠানের ভেঙে পড়ার চিত্রই স্পষ্ট হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলমান ‘মবোক্রেসি’র পুনরাবৃত্তি এই ঘটনা এবং সংস্কৃতিচর্চাকে অবহেলার ফলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
রেজাউর রহমান লেনিন বলেন, ডিএফপিতে নিয়োগ ও কার্যক্রমের মধ্যে এমন দুর্নীতির কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা শিল্পচর্চার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
শহিদুল আলম এ ঘটনাকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, শুধু সাময়িক বরখাস্ত নয়, দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রকাশ্য ঘটনায় অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে এত দেরি কেন, এ প্রশ্নও এখন জরুরি।
মোশফিকুর রহমান জোহান বলেন, অতীতে নিপীড়নের বিরুদ্ধে যারা কথা বলতেন, এখন তাদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন। তিনি অভিযোগ করেন, মামলা দায়েরের সময় বিভিন্ন মহল থেকে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা হয়েছে এবং ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।
লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, হামলার ঘটনায় রমনা থানায় অভিযোগ দায়ের করা হলেও ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও মামলা রুজু হয়নি। পাশাপাশি ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজও পাওয়া যায়নি, যা ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও বক্তারা এটিকে অপর্যাপ্ত পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বক্তারা বলেন, এই হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর ধারাবাহিক আঘাতের অংশ। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে সাংস্কৃতিক অঙ্গন আরও অনিরাপদ হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলন থেকে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের স্থায়ী অপসারণ ও বিচার, হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা, সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে পদ্ধতিগত দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।
সিএ/এএ


