শুক্রবার (৬ মার্চ) ‘জাতীয় পাট দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পাট ও পাটজাত পণ্যের সম্ভাবনাকে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পণ্যের চাহিদা বাড়ছে, তাই এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাজারকে কাজে লাগাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘স্বল্পমূল্যে পাটের ব্যাগ তৈরি ও বিপণন করুন। বিশ্ব এখন টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। এই সম্ভাবনার সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে।’ তিনি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারের পরিবর্তে পাটের ব্যাগ ও পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং বলেন, ‘পাটপণ্যকে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দিন। সাশ্রয়ী মূল্যের পাটের ব্যাগ ও পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহার করুন।’
রাষ্ট্রপতি উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা বিবেচনায় রেখে নতুন, আধুনিক, মানসম্মত, নান্দনিক ও ব্যবহার উপযোগী পণ্য উদ্ভাবনের আহ্বান জানান। তিনি পাটখাতে আধুনিক বিজ্ঞান ও উপযোগী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন এবং বলেন, পাটজাত পণ্যে নতুন উদ্ভাবন ও বৈচিত্র্য আনতে হবে।
তিনি পাটচাষীদের উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চফলনশীল চাষপদ্ধতি অনুসরণ করে মানসম্মত আঁশ উৎপাদনে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি পণ্যের টেকসই মান বজায় রাখা, নতুন ডিজাইন উদ্ভাবন এবং ব্যবহারযোগ্যতার বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন। রাষ্ট্রপতির মতে, এই খাতে দক্ষ জনবল তৈরি এবং পাটপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি।
রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পাট ও পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো, নতুন উদ্ভাবন ও বৈচিত্র্য সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, শিল্পের আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে বাজার সম্প্রসারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পাটচাষী, শ্রমিক, উৎপাদক, শিল্পোদ্যোক্তা, রপ্তানিকারক ও নীতিনির্ধারকসহ সরকারি-বেসরকারি সব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান জনবান্ধব সরকারের উদ্যোগে পাটখাতের সোনালি দিন আবার ফিরে আসবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তিনি পাটকে বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ’ নীতির ভিত্তিতে বিভিন্ন খাতভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। সরকার ইতোমধ্যে রুগ্ন ও বন্ধ পার্টিকলসহ বিভিন্ন শিল্প-প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করে নতুন কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, সরকার পাটখাতকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে গবেষণা সম্প্রসারণ, উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ উদ্ভাবন এবং পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়াতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের সহায়তায় নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১০ দিনের মাথায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার ফলে ১১ লাখের বেশি কৃষক সরাসরি উপকৃত হয়েছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, এর ফলে পাটসহ কৃষিখাতে নতুন কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে এবং উৎপাদন বাড়বে। কৃষকদের জীবনমান উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে এ সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রথমবার সরকার গঠনের পরও ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সুদ-আসল মওকুফ করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, ‘হাজারো প্রাণের বিনিময়ে দেশ গণতন্ত্রের ধারায় ফিরেছে’ এবং শহীদদের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়তে হলে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হয়ে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করতে হবে।
রাষ্ট্রপ্রধান জানান, কৃষকবান্ধব সরকার আগামী পহেলা বৈশাখ থেকে পর্যায়ক্রমে কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু করবে। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, সাশ্রয়ী মূল্যে কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ, ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও বীমা সুবিধা এবং ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রির সুযোগ পাবেন। এছাড়া কৃষি প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আবহাওয়া ও বাজার সংক্রান্ত তথ্যসহ কৃষি সংশ্লিষ্ট নানা তথ্যও জানা যাবে।
অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে আয়োজিত নয়দিনব্যাপী ‘পাট ও বহুমুখী পাটপণ্যের মেলা’-এর ভার্চুয়াল উদ্বোধন করেন। এ সময় পাটখাতের উন্নয়নে অবদান রাখায় ১৯ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয় এবং জাতীয় পাট দিবস উপলক্ষে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।
অনুষ্ঠানে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, সচিব বিলকিস জাহান রিমি, পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মো. নূরুল বাসির এবং বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবুল হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।
সিএ/এএ


