শুক্রবার (৬ মার্চ) যশোরে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সম্মেলনে বোমা হামলার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। দুপুরে শহরের কোর্ট মোড়ে উদীচী যশোর জেলা সংসদের উদ্যোগে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলার সাংস্কৃতিক কর্মী, বিভিন্ন পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, উদীচী হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচারের বিষয়ে যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, তারা কেউই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়নি। দীর্ঘ ২৭ বছর পেরিয়ে গেলেও অজ্ঞাত কারণে তদন্ত কার্যক্রম স্থবির হয়ে রয়েছে। তাদের মতে, উদীচীর ওপর বোমা হামলার ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হলে পরবর্তী সময়ে দেশে সংঘটিত একের পর এক বোমা হামলার সুযোগ হামলাকারীরা পেত না। বক্তারা অভিযোগ করেন, এত বছর পার হলেও নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের মূল ঘাতকদের আইনের মুখোমুখি করা যায়নি এবং ঘটনার প্রকৃত রহস্যও উদঘাটিত হয়নি। তারা এটিকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
উদীচী যশোর জেলা সংসদের সভাপতি আমিনুর রহমান হিরু বলেন, ‘২৭ বছর পার হলেও উদীচীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞের কুশীলবদের চিহ্নিত করা যায়নি। উদীচী হত্যাকাণ্ডের এই বিচারহীনতা রাষ্ট্রের দুর্বলতা। সেই দুর্বলতার সুযোগেই জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো তাদের বিস্তার ঘটিয়েছে। ২৭ বছর ধরেই আমরা বিচারহীনতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছি। শুরুতেই যদি সঠিক তদন্তের মাধ্যমে উদীচী ট্র্যাজেডির দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের স্বরূপ উন্মোচন করা যেত তাহলে হয়তো জঙ্গীদের উত্থানের পরবর্তী ঘটনাগুলো ঘটতো না।’
উদীচী কর্মী সুকান্ত দাস ওই বোমা হামলার আহতদের একজন। তিনি এখনো সেই দিনের ভয়াবহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন। হামলায় তার একটি পা হারাতে হয়েছে এবং হাত ও কানে গুরুতর ক্ষতি হয়েছে। মানববন্ধনে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু বিচার করেনি কেউ। সবাই বিচারের নামে প্রহসন করেছে।’
সুকান্ত দাস আরও বলেন, ‘২৭ বছর রহস্য উদঘাটন করা যায়নি; এমনকি মামলাটার কি অবস্থা সেটা আমরা কেউ জানি না। একটি পা কেটে কৃত্রিম পা লাগিয়ে হাঁটতে হয়। ২০২২ সালে ভারত থেকে কান অপারেশন করি। প্রতিনিয়ত পায়ে যন্ত্রণা করে। বেশি হাঁটতে পারি না। হাত দিয়ে লিখতে পারি না। ২৭ বছর ধরে বাম হাত দিয়ে খাওয়া, লেখাসহ যাবতীয় কাজ করতে হয়। এত কষ্টের পরও এটা বলতে লজ্জা লাগে; এখনও রাষ্ট্রের কাছে বিচার পেলাম না।’
‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে’ শিরোনামে আয়োজিত যশোর হত্যাকাণ্ড দিবসের এই প্রতিবাদ মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন উদীচী যশোর জেলা সংসদের সভাপতি অ্যাডভোকেট আমিনুর রহমান হিরু। এতে বক্তব্য দেন যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা একরাম-উদ-দ্দৌলা, শিল্পকলা অ্যাকাডেমি যশোরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহমুদ হাসান বুলু, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোরের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু, চাঁদের হাট যশোরের সভাপতি ফারাজী আহমেদ সাঈদ বুলবুল, যশোর কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তাক হোসেন শিম্বা, উদীচীর সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব এবং সংস্কৃতিজন বাসুদেব বিশ্বাসসহ আরও অনেকে। সমাবেশে নেতারা উদীচী হত্যাকাণ্ডের পুনঃতদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোর টাউন হল মাঠে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলন চলাকালে বোমা হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় শিল্পীসহ ১০ জন নিহত হন এবং শতাধিক মানুষ আহত হন।
সিএ/এএ


