কবি মোহন রায়হানকে ২০২৫ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (কবিতা) দেওয়ার জন্য অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় দেশের সাহিত্য ও শিল্প অঙ্গনসহ বিদগ্ধ মহলে আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে বাংলা একাডেমির স্বায়ত্তশাসনের ভূমিকাকেও প্রশ্ন করছেন।
গত বছরও ২০২৪ সালের পুরস্কার ঘোষণাকে ঘিরে একই ধরনের বিতর্ক হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ বিভাগে মোহাম্মদ হাননান এবং শিশুসাহিত্যে ফারুক নওয়াজের নাম ঘোষণা করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। কথাসাহিত্য বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত সেলিম মোরশেদ তখন নিজের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোহন রায়হানের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ আছে। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার পর পুরস্কার পুনরায় ঘোষণা করা হবে। আগের সরকারের সময়ে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল, এখন বিষয়টি আমাদের খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ তবে তিনি অভিযোগের ধরণ প্রকাশ করেননি।
মোহন রায়হান বলেন, ‘এই পুরস্কার নেওয়ার আর প্রশ্ন নেই। আমার সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা অমানবিক। আমি পুরস্কার চাইনি। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ থাকলেও আমাকে শেষ মুহূর্তে জানানো হলো, বিশেষ কারণে পুরস্কার দেওয়া যাচ্ছে না। তবে আমি জীবন সদস্য হিসেবে উপস্থিত থাকতে পারি।’ তিনি আরও জানান, অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রথমে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়।
বাংলা একাডেমির পুরস্কারপ্রক্রিয়া অনুসারে, নির্বাহী পরিষদ ৩০ জন ফেলোকে নিয়ে একটি প্রস্তাবক কমিটি গঠন করে। মহাপরিচালক সাত সদস্যের পুরস্কার কমিটি গঠন করেন এবং চূড়ান্ত নাম নির্বাহী কমিটির কাছে পাঠানো হয়। নির্বাহী কমিটি কোনো নতুন নাম যুক্ত করতে পারে না, কিন্তু যৌক্তিক কারণে কোনো নাম বিবেচনা না করার ক্ষমতা রাখে। সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ বলেন, ‘গত বছর এবং এ বছর দেখা গেছে চূড়ান্ত মনোনয়নের পরও কোনো কোনো পুরস্কারপ্রাপ্তের নাম পরিবর্তন বা স্থগিত করা হয়েছে, যা নীতিমালার পরিপন্থী।’
বাংলা একাডেমির স্বশাসনের অভাবও আলোচনায় এসেছে। এক কর্মকর্তা জানান, গত দুই দশকে মন্ত্রণালয় একাডেমির ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে, ফলে প্রতিষ্ঠানটি জনসাধারণের কাছে সমালোচিত ও নিন্দিত হয়েছে।
পুরস্কার বিতর্ক নতুন নয়। ১৯৭২ সালে বদরুদ্দীন উমর এবং ১৯৮২ সালে নাট্যকার মামুনুর রশীদ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ২০১৭ সালে অনুবাদ সাহিত্যে পুরস্কারপ্রাপ্ত নিয়াজ জামান অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না পেয়ে পরবর্তীতে বাসভবনে পুরস্কার গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালে জাকির তালুকদারও পুরস্কার ফেরত দিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নাট্য সংগঠক সামিনা লুৎফা বলেন, ‘বাংলা একাডেমির স্বশাসন থাকা উচিত এবং সরকারের উচিত এটি সম্মান করা। একজন কবি কী লিখবেন তা তাঁর বিষয়, সরকারের নয়। শিল্পী-সাহিত্যিকদের স্বাধীনতা থাকা দরকার।’
সিএ/এমই


