মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার সরকারি নিউ সমনবাগ চা-বাগানে সরকারি তালিকায় থাকা শ্রমিকদের মধ্যে বহুজনের অস্তিত্ব নেই। চা-বাগানের খাতায় নাম আছে, প্রভিডেন্ট ফান্ডের হিসাব আছে, নিয়মিত হাজিরা ও রেশন তালিকায় সইও আছে, কিন্তু তাঁদের কেউ বহু বছর আগে মারা গেছেন, কেউ অবসরপ্রাপ্ত, কেউ আবার বাস্তবে নেই। ২১ ফেব্রুয়ারি বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে সরেজমিনে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
চা বোর্ডের তদন্তে দেখা গেছে, মৃত, অবসরপ্রাপ্ত ও অস্তিত্বহীন শ্রমিক অন্তত ৪০ জন, এবং আরও ১৭০ জন ভুয়া নাম-ঠিকানায় বেতন তুলছেন। ১ হাজার ৮২০ জন শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ৩১৫ জনের তথ্য সঠিক। ১ হাজার ১৬০ জনের নিয়োগপত্র জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে মিলছে না। ৮০ জনের বয়স ৬০ বছরের বেশি, অথচ তারা এখনও বেতন পাচ্ছেন।
চা বোর্ডের ছয় সদস্যের তদন্ত দল ৫ জানুয়ারি থেকে ৯ দিন ধরে বাগানে অনুসন্ধান চালায়। তদন্ত শুরু হওয়ার পর ভুয়া শ্রমিকরা সংঘবদ্ধ হয়ে দলকে বাধা দেয় এবং গাড়িতে হামলা চালায়। তদন্ত প্রতিবেদনে অবৈধ শ্রমিকদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ করা হয়েছে বাগানের পঞ্চায়েত সমিতির বিরুদ্ধে।
নিউ সমনবাগ চা-বাগান ২ হাজার ৯৬ একর জায়গায় ১ হাজার ৮২০ শ্রমিক নিয়ে কাজ করে। ২০২৪ সালে এখানে উৎপাদন হয়েছে ৭ লাখ ৯২ হাজার কেজি চা। তুলনামূলকভাবে বেসরকারি মধুপুর চা-বাগান (৯৩০ একর, ৬৫৫ শ্রমিক) ৮ লাখ ৮৭ হাজার কেজি চা উৎপাদন করেছে। সরকারি বাগানের মাথাপিছু উৎপাদন ৪৩৫ কেজি, বেসরকারি বাগানের ১ হাজার ২০১ কেজি।
২০১৫ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত নিউ সমনবাগ চা-বাগান নতুন চারা লাগাতে ১৭ কোটি টাকা পেয়েছে, তবে ৩০ শতাংশ জমিতে চারা লাগানো হয়নি। বাকি ৭০ শতাংশ বাগানে চায়ের গড় বয়স ৪৫ বছর। বয়স্ক চারা উৎপাদনের মান ও পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে।
সরকারি বাগানগুলোতে উৎপাদিত চায়ের প্রায় অর্ধেক বিক্রি হয় না। ২০২৫ অর্থবছরে চারটি সরকারি বাগান ৫২ লাখ ৫৭ হাজার ৩০০ কেজি চা বিক্রি করতে পারেনি। বেতন দিতে গত আট বছরে চা বোর্ডের স্থায়ী আমানত ভেঙে ৩৩ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
তবে সংকটের মধ্যেও সম্ভাবনা আছে। ন্যাশনাল টি কোম্পানির চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ বলেন, এবার চায়ের চাহিদা ভালো এবং নিলামে প্রতি কেজিতে ২৪৫–২৫৩ টাকা পর্যন্ত দাম পাওয়া যাচ্ছে। চায়ের মান উন্নয়নের জন্য ২০ জন ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার আনা হচ্ছে। গ্রিন টি, হোয়াইট টি, ইয়েলো টি ও এক্সপেরিমেন্টাল টি উৎপাদনের দিকে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
চা-বাগানগুলোতে সমস্যার মূল কারণ হিসেবে চা-বাগানের পুঞ্জীভূত লোকসান, শ্রমিকদের দক্ষতার ঘাটতি, সরকারি হস্তক্ষেপে রাজনৈতিক নিয়োগ, বিনিয়োগের ঘাটতি এবং ব্যাংকঋণে উচ্চ সুদ ইত্যাদি চিহ্নিত করা হয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত


