সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বৃহস্পতিবার (২০ ফেব্রুয়ারি) সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে তোলা চাঁদাবাজি অনেকটাই বৈধতা পেয়েছে এমন মনোভাব প্রকাশ করেছেন। মন্ত্রী জানান, এই অর্থ আদায় “সমঝোতার ভিত্তিতে” হচ্ছে এবং জোর করে আদায় করা হচ্ছে না, তাই এটি চাঁদা হিসেবে গণ্য করা যায় না।
সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী রেল সম্প্রসারণ, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খাল পুনঃখনন ও সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিক ৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের কথা জানান। তবে পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা মন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করছেন। তারা মনে করেন, বছরে হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয় এবং এর কারণে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা নেই। ২০২৪ সালের ৫ মার্চ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। এই অর্থের ভাগ পায় দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তি, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ কর্মকর্তা-কর্মচারী, মালিক-শ্রমিক সংগঠন ও স্থানীয় প্রশাসন।
মন্ত্রী রবিউল আলম বলেন, “সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা কল্যাণের জন্য এটা ব্যয় করে। এটা অলিখিত বিধির মতো। চাঁদা হলো সেই টাকা যেটা দিতে কেউ চায় না বা বাধ্য করা হয়। এখানে সমঝোতার ভিত্তিতে কাজ করা হয়।” তিনি আরও জানান, সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা চাঁদা বাড়তি বা কাউকে বঞ্চিত করছে কি না, তা সরকার খতিয়ে দেখবে।
পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলেন, মালিক-শ্রমিকদের কল্যাণের নামে তোলা অর্থের কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, “পরিবহন খাতের পরিচালন ব্যয়ের বাইরে যেকোনো ‘ছায়া’ খরচ অবৈধ। চাঁদা বা কল্যাণ খরচ যেভাবেই দেখানো হোক না কেন, এটি জনগণের ওপর চাপ তৈরি করে। শুরুতেই চাঁদাবাজি বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে, নতুবা পরে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হবে না।”
চাঁদা বৈধতার ইতিহাস অনুসারে, ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের সময় একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার বিষয়টি সংশোধন করে নতুন সুপারিশ তৈরি করেছিল। খসড়া নীতিমালায় বলা হয়, মালিক সমিতি সর্বোচ্চ ৪০ টাকা, শ্রমিক ইউনিয়ন সর্বোচ্চ ২০ টাকা এবং শ্রমিক ফেডারেশন সর্বোচ্চ ১০ টাকা করে চাঁদা তুলতে পারবে। তবে সমালোচনার কারণে এটি অনুমোদিত হয়নি। পরবর্তীতে ৭০ টাকা চাঁদার প্রথা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে যায়।
মন্ত্রী রবিউল আলম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নতুন সরকার রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনাকে জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে কাজ করছে। অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ, রেল খাত উন্নয়ন, ঘরমুখী যাত্রীদের সুবিধা ও বাসের বিশেষ লেন (বিআরটি) প্রকল্প পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তিনি নিশ্চিত করেন, সরকারি কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব ও চাঁদাবাজিকে কোনও প্রাধান্য দেওয়া হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব নুরুন্নাহার চৌধুরী, ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানির এমডি ফারুক আহমেদ, বিআরটিএ চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ, সওজ প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মইনুল হাসান প্রমুখ।
সিএ/এমই


