ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে—দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, গুঞ্জন ও আশঙ্কার অবসান ঘটিয়ে। প্রায় ১৫ মাস ধরে নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছে জনমনে। শেষ মুহূর্তে নির্বাচন স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা, রাস্তায় ‘মব সহিংসতা’ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেককে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। তবে সরকার শুরু থেকেই নির্বাচন আয়োজনের আশ্বাস দিয়ে এসেছে। শনিবার (৬ ডিসেম্বর) ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক ছিল বলে পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। যাঁরা ভোট দিতে চেয়েছেন, তাঁরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। এ জন্য অন্তর্বর্তী সরকার, সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে।
নির্বাচনে কয়েকজন প্রার্থীর ফল বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিএনপি–জোটের বাইরে লড়ে রুমিন ফারহানার জয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে। পাশাপাশি একক লড়াইয়ে উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছেন তাসনিম জারা। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত নারীদের মনোনয়ন দিতে অনীহা দেখায়—এই বাস্তবতার মধ্যে দলীয় প্রতীক ছাড়াও নারীরা ভালো করতে পারেন, তার উদাহরণ হিসেবে এই দুই প্রার্থীর ফলাফলকে দেখা হচ্ছে।
ভোটের আগে নানা পূর্বাভাসে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয় পেয়েছে বলে বেসরকারি হিসাবে জানা গেছে। আরও দুটি আসনে জয়ী হলেও আদালতের নিষেধাজ্ঞায় ফল ঘোষণা স্থগিত রয়েছে। অনেকের ধারণা ছিল জামায়াতের উত্থান বড় আকারে হবে। যদিও সরকার গঠনের পর্যায়ে যেতে পারেনি, তবে ৬৮টি আসন পেয়ে দলটি তাদের অতীতের সর্বোচ্চ ফল করেছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বাইরে নতুন কিছু এলাকায়, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় শক্ত অবস্থান জানান দিয়েছে দলটি।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ছয়টি আসন পেয়েছে এবং একাধিক আসনে উল্লেখযোগ্য ভোট সংগ্রহ করেছে। তরুণ নেতৃত্বের এই অংশ সংসদে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা তুলে ধরবে—এমন আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
এবারের প্রচারণা সময়ের দিক থেকে সংক্ষিপ্ত ছিল। তবুও বড় দুই দলের মধ্যে অতীতের মতো তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়নি। বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ যেমন উঠেছে, তেমনি জামায়াতকে শরিয়াহ ও নারী–সংক্রান্ত অবস্থান স্পষ্ট করতে হয়েছে। ভারতবিরোধিতা ইস্যু বড় আকারে সামনে আসেনি। নির্বাচন নিয়ে বড় ধরনের অভিযোগ এখনো সামনে আসেনি; বিচ্ছিন্ন অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ পদক্ষেপের ওপর আস্থার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশ্লেষক রওনক জাহান মনে করেন, সরকার চাইলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব—এবারের ভোট তার প্রমাণ। তবে সামনে নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ কম নয়। জুলাই–পরবর্তী সময়ে জনগণের প্রত্যাশা বেড়েছে। সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ও নিজেদের ভেতরের কোন্দল–সহিংসতা চায় না। “বিজয়ীরা সবকিছু নিয়ে নেবে—এই চর্চা যেন না থাকে।” গণতন্ত্রে বারবার উত্তরণ হলেও টিকে না থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে বিজয়ীদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রবণতার কথা তুলে ধরেন তিনি।
রাজনীতিকে অর্থ উপার্জন বা আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করার আহ্বানও জানান তিনি। সংসদ সদস্য ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের স্বার্থের সংঘাত থাকলে তা প্রকাশ করার প্রস্তাব দেন। দলীয়করণ বন্ধ, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং সম্পদের হিসাব প্রকাশের সংস্কৃতি চালু রাখার বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করেন। সংসদ সদস্যদের বিনা শুল্কে গাড়ি কেনার সুবিধা ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে থাকার সুযোগ বাতিলের মতো পদক্ষেপ বিবেচনার কথাও বলেন।
জামায়াতের প্রতি প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে সংসদ ও সংসদীয় কমিটিতে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে হবে। রাজপথের হুমকির বদলে কার্যকর সংসদীয় চর্চা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে উল্লেখিত ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং বা রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের তাগিদ দেন রওনক জাহান। জুলাই–পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া মামলাগুলোতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার ওপর জোর দেন তিনি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা ও সহনশীলতা নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র টেকসই হয় না—এমন সতর্কবার্তাও দেন তিনি।
রওনক জাহান: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সিএ/এমই


