অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এই বিবরণী অনুযায়ী, গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মোট পরিসম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫ টাকা। এক বছর আগে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৪ কোটি ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৭৩ টাকা। সে হিসাবে এক বছরে তাঁর সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ ৪ হাজার ৩৯২ টাকা।
বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে, সঞ্চয়পত্র নগদায়ন, সঞ্চয়ী ও মেয়াদি আমানতে অর্থ বৃদ্ধির পাশাপাশি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া শেয়ারসহ বিভিন্ন কারণে প্রধান উপদেষ্টার মোট সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্পদের হিসাবে তাঁর আর্থিক সম্পদের পরিমাণ ১৪ কোটি ৭৬ লাখ ৬৪ হাজার ৪০১ টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১৩ কোটি ১৮ লাখ ৭১ হাজার ৪৩৩ টাকা। এ ছাড়া তাঁর নন–ফাইনান্সিয়াল সম্পদের পরিমাণ ২১ লাখ ৬ হাজার ২৫০ টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ২০ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা। দেশের বাইরে তাঁর সম্পদের পরিমাণ ৬৪ লাখ ৭৩ হাজার ৪১৪ টাকা, যা আগের বছর ছিল ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৭৪০ টাকা।
আয়কর আইন অনুযায়ী, একজন করদাতার মালিকানাধীন স্থাবর, অস্থাবর, আর্থিক ও মূলধনি সম্পত্তির সমষ্টিকেই পরিসম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের আয়কর আইন প্রণয়নের সময় আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসরণ করে এই সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়। সেখানে আর্থিক সম্পদের মধ্যে নগদ অর্থ, ব্যাংকে জমা টাকা, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার ও বিভিন্ন কোম্পানি থেকে পাওয়া লভ্যাংশ অন্তর্ভুক্ত থাকে। আর নন–ফাইনান্সিয়াল সম্পদের মধ্যে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লটসহ অন্যান্য স্থাবর সম্পদ অন্তর্ভুক্ত।
বিবরণী অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টার স্ত্রী আফরোজী ইউনূসের মোট পরিসম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ২৭ লাখ ৬৩ হাজার ৩৬০ টাকা। আগের অর্থবছরে তাঁর সম্পদের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ১১ লাখ ৭৭ হাজার ২৭৪ টাকা। সে হিসাবে এক বছরে তাঁর সম্পদ কমেছে ৮৪ লাখ ১৩ হাজার ৯১৪ টাকা। তাঁর আর্থিক সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে ৪ লাখ ৫১ হাজার ৮৬০ টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ৯৫ লাখ ৪১ হাজার ৬৭৯ টাকা। অন্যদিকে নন–ফাইনান্সিয়াল সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ১১ হাজার ৫০০ টাকা, যা আগের বছর ছিল ১ কোটি ১৬ লাখ ৩৫ হাজার ৫৯৫ টাকা। তাঁর বিদেশে কোনো সম্পদ নেই।
দায়-দেনার হিসাবে দেখা গেছে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কোনো দায় নেই। তবে তাঁর স্ত্রীর ১৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকার দায় রয়েছে।
২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, সব উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাঁদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করবেন। পর্যায়ক্রমে এটি সরকারি সব কর্মকর্তার জন্যও নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক করা হবে। একই ভাষণে তিনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ন্যায়পাল নিয়োগে অধ্যাদেশ প্রণয়নের কথাও উল্লেখ করেছিলেন।
এর পর ওই বছরের ১ অক্টোবর ‘অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা, ২০২৪’ জারি করা হয়। নীতিমালায় বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সর্বশেষ তারিখের পরবর্তী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাঁদের আয় ও সম্পদের বিবরণী জমা দেবেন। স্ত্রী বা স্বামীর পৃথক আয় থাকলে সেটিও বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এসব বিবরণী প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বিবেচনায় উপযুক্ত পদ্ধতিতে প্রকাশ করবেন।
তবে দীর্ঘদিন বিবরণী প্রকাশ না হওয়ায় সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) জানিয়েছিলেন, দু-এক দিনের মধ্যেই উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করা হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় উপদেষ্টা পরিষদে সংযোজন-বিয়োজন হয়। বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যসংখ্যা ২১ জন। এ ছাড়া উপদেষ্টা পদমর্যাদায় বিশেষ সহকারী, বিশেষ দূত ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রয়েছেন চারজন এবং প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার চার বিশেষ সহকারী দায়িত্ব পালন করছেন। মঙ্গলবার প্রকাশিত বিবরণীতে তাঁদের সবার আয় ও সম্পদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সিএ/জেএইচ


