ভোটের মাঠে সামনে থাকে পুরুষ প্রার্থীর নাম, প্রতীক ও স্লোগান। কিন্তু ঘরের ভেতরে ঢোকার দরজাটি খুলে দিচ্ছেন নারীরাই। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়ার কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন একদল নারী। তাদের কেউ সাবেক শিক্ষক, কেউ গৃহিণী, কেউ ধর্মীয় তালিমের সঙ্গে যুক্ত।
ভোটের মাঠে সক্রিয় এই নারীরা নিজেরাই স্বীকার করছেন, তাদের প্রচার কেবল রাজনৈতিক নয়; তা দাঁড়িয়ে রয়েছে সামাজিক সম্পর্ক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর।
বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রচারে এই চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখানেই রাজনীতির কৌশল। পুরুষ কর্মীরা যেখানে ঘরের ভেতরে ঢুকতে পারেন না, সেখানে নারী কর্মীরা সহজেই প্রবেশ করতে পারছেন। রান্নাঘর, উঠান কিংবা তালিমের আসর—এই ব্যক্তিগত পরিসরগুলোই হয়ে উঠছে ভোটের ক্ষেত্র।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতিতে নারীকে বিশ্বাসযোগ্য ও নরম মুখ হিসেবে ব্যবহার নতুন কিছু নয়। কঠিন রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিতে এই কৌশল কার্যকর। ধর্মের নামে ভোট চাওয়ার অভিযোগ উঠলে প্রার্থী সরাসরি দায় এড়াতে চাইলে এই কৌশল আরও সুবিধাজনক হয়ে ওঠে।
প্রচারণার ভাষা ও কৌশলে দরজায় কড়া নাড়ার পর পরিচয় আসে ধর্মের ভাষায়। নিজেকে মুসলমান পরিচয় দিয়ে আরেক মুসলমানের কাছে একটি দাবি তোলা হয়। বলা হয়, ভোট দিতে হবে মুসলমানের পক্ষেই, ইসলামের পথে, কোরআনের আলোয়।
বরিশাল-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে এভাবেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন মোসাম্মদ নাসিমা খানম। বাকেরগঞ্জ উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা নাসিমা খানম পেশাগত জীবনে একসময় শিক্ষকতা করেছেন। তিনি বোয়ালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
গত পাঁচ মাস ধরে তিনি বাকেরগঞ্জের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও মাদরাসায় নিয়মিত তালিমে অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছেন ভোটের প্রচার। তার মূল লক্ষ্য নারী ভোটাররা।
প্রচারণার কৌশল সম্পর্কে নাসিমা খানম বলেন, তিনি নারী ভোটারদের বোঝান যে তারা ইসলামের পক্ষ থেকে, কোরআনের পক্ষ থেকে এসেছেন। তাঁর ভাষায়, দেশে কোরআনের আইন প্রতিষ্ঠা মানে কোরআনকে আরও বিশ্লেষণ করা, কোরআন নিয়ে গবেষণা করা এবং কোরআনের বিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করা। এই বক্তব্যই তিনি ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তুলে ধরছেন।
নাসিমার দাবি, তাঁর সঙ্গে কথা বলা অনেক ভোটারই একমত হচ্ছেন। মুসলমান হিসেবে মুসলমানের পথে একটি ভোট দেওয়াকে তারা স্বাভাবিক বলেই দেখছেন। আল্লাহর পথে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা দেখছেন না বলেও তিনি জানান।
বোয়ালিয়া ইউনিয়নে নাসিমা খানম একটি বিশেষ সামাজিক অবস্থানে রয়েছেন। কারও মৃত্যু হলে গোসল করানোর দায়িত্বও পালন করেন তিনি। এই সামাজিক ভূমিকাই এখন রাজনৈতিক পুঁজি হয়ে উঠেছে।
নাসিমা বলেন, ‘আমি একটা কথা বললে মানুষ ভাবে, আপা বলছে মানে গুরুত্ব আছে।’ তাঁর এই বক্তব্যেই স্পষ্ট, ভোটের প্রচারে নারীর ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতাই হয়ে উঠেছে প্রধান শক্তি। সেই বিশ্বাস থেকেই সংগঠনের বাইরে থাকা নারীরাও প্রচারণায় যুক্ত হচ্ছেন।
নাসিমার সঙ্গে প্রচারে নামছেন আরও আট থেকে ১০ জন নারী। তাদের বেশির ভাগই তালিমের সঙ্গে যুক্ত। কেউ কেউ সরাসরি জামায়াতের অনুসারী নন। তবে তাদের সন্তান নাসিমার কাছে কোরআন শেখে। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরেই তারা প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন।
জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীদের প্রচার দলগতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। দাড়িয়াল ইউনিয়নে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পাপড়ি আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমরা টিমওয়াইজ বের হই। ছয়জন, কখনও ১০ জন। মূলত বোনদের কাছেই যাই।’
সংখ্যালঘু বা অন্য ধর্মাবলম্বী নারী ভোটারদের বিষয়ে নুরুনিসা সিদ্দিকা বলেন, জিহাদ কোরআনের পরিভাষা এবং এটি মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য। অমুসলিমদের ক্ষেত্রে জিহাদের আহ্বান দেওয়া হয় না; তাদের কাছে দাওয়াত উপস্থাপন করা হয়। তাঁর দাবি, তারাও এই প্রচারকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছেন।
তবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধর্মের নামে ভোট চাওয়ার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন বরিশাল-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মাওলানা মাহমুদুন্নবী। তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগ প্রতিপক্ষের সাজানো অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা।’
মাহমুদুন্নবী বলেন, ‘ভোট চাওয়ার অধিকার সবারই রয়েছে। জামায়াতের কর্মীরাও সেই অধিকার অনুযায়ী মানুষের কাছে যাচ্ছেন। তবে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বা ইসলামের নামে জান্নাত পাওয়ার কথা বলে ভোট চাওয়ার অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘নারী কর্মীরা মা-বোনদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই যাচ্ছেন। বেহেশত বা জান্নাতের টিকিটের মতো কোনো কথা বলা হচ্ছে না।’ এসব বিষয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে বলে তাঁর দাবি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, প্রার্থীরা নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষায় সতর্ক থাকেন। তৃণমূলের কর্মীরা যা বলছেন, সেটিকে অনেক সময় ব্যক্তিগত উদ্যোগ বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। এতে দলও বাঁচে, প্রচারও হয়। কিন্তু এর মূল্য দিচ্ছেন নারীরাই। সামাজিক সম্পর্কের ঝুঁকি, ধর্মীয় দায়—সব মিলিয়ে তারা হয়ে উঠছেন এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার নীরব ও অদৃশ্য কর্মী।
সিএ/এএ


