ঝালকাঠী-১ (রাজাপুর-কাঠালিয়া) আসনে নির্বাচনী প্রচারে ভিন্ন এক চিত্র সামনে এসেছে। গ্রামের উঠানে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ফয়জুল হক—এমন দৃশ্য গ্রামবাংলার নির্বাচনে পরিচিত। তবে চোখ ফেরালেই দেখা যাচ্ছে, তাঁর খুব কাছাকাছি অবস্থানে ইউনিফর্ম পরা পুলিশ সদস্যরা দাঁড়িয়ে আছেন, কখনো আবার কর্মসূচি শেষে পুলিশের মোটরসাইকেলের পেছনে বসে সভাস্থল ত্যাগ করছেন তিনি।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, তফসিল ঘোষণার পর একটি নির্দিষ্ট প্রার্থীর সঙ্গে এভাবে পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি নির্বাচনী মাঠে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিশেষ ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়। এতে ভোটের পরিবেশ ও সমান সুযোগের প্রশ্ন সামনে আসছে। গত ১৯ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৭টা ৫৭ মিনিটে রাজাপুরের মঠবাড়ী ইউনিয়নের বাদুরতলা বাজারে এমন দৃশ্য ধারণ করে একটি জাতীয় দৈনিক। পরে সেসব ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
জানা গেছে, তফসিল ঘোষণার পর বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন পান ফয়জুল হক। এরপর থেকে তাঁর একাধিক উঠান বৈঠক ও প্রচারণায় নিয়মিত পুলিশের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কোথাও তারা দূরে দাঁড়িয়ে নজরদারি করছেন, আবার কোথাও প্রার্থীর একেবারে কাছাকাছি অবস্থান করছেন। বক্তব্যের সময় মঞ্চের পাশে বা পেছনে দাঁড়িয়ে থাকার ঘটনাও দেখা গেছে।
ঝালকাঠী-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন, জামায়াতের প্রার্থী ঘোষণার পর পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। তফসিল ঘোষণার দিন থেকে পুলিশ প্রটেকশন নিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ের নামে প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিষয়টি রিটার্নিং কর্মকর্তার নজরে আনার চেষ্টা করা হলে জানানো হয়, আবেদন করেই পুলিশ প্রটেকশন নেওয়া হয়েছে। তবে ২৩ জানুয়ারি থেকে হঠাৎ করে প্রত্যেক প্রার্থীকে দুইজন করে পুলিশ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীকে পুলিশি প্রটেকশন দিতে হলে ঝুঁকি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক। মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, ঝালকাঠী-১ আসনের ৫০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে গালুয়া, বড়ইয়া ও মঠবাড়ী ইউনিয়নে ২৭টি কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুটি কেন্দ্রকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটকেন্দ্রিক সহিংসতার কোনো তথ্য পুলিশের নথিতে নেই, কিংবা কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগও পাওয়া যায়নি।
এরপরও রাজাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জামায়াত প্রার্থীর ঘরোয়া বৈঠকে নিয়মিত পুলিশের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে কোনো রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সহিংসতার ঘটনাও ঘটেনি। থানার রেকর্ড ও স্থানীয় সংবাদ আর্কাইভেও বড় ধরনের ঘটনার উল্লেখ নেই। গোয়েন্দা সতর্কতা বা ডিবি শাখার কোনো লিখিত প্রতিবেদনের কথাও জানা যায়নি।
আরেকটি প্রশ্ন উঠেছে—যদি ঝুঁকি থেকেই থাকে, তবে একই এলাকায় অন্য প্রার্থীদের কর্মসূচিতে পুলিশের উপস্থিতি কেন নেই? মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, একই ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডে অন্য প্রার্থীদের উঠান বৈঠকে পোশাকধারী পুলিশের উপস্থিতি ছিল না।
পুলিশি প্রটেকশনের ধরন নিয়েও আচরণবিধির সীমা অতিক্রমের অভিযোগ উঠেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যরা ইউনিফর্মে, কোথাও সশস্ত্র অবস্থায় প্রার্থীর খুব কাছাকাছি থাকছেন। অনেক সময় কর্মসূচি শেষে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাওয়ার সময়ও তাঁরা প্রার্থীর সঙ্গে রয়েছেন। এতে নিরাপত্তা ও কার্যত এসকর্টের পার্থক্য স্পষ্ট থাকছে না বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজাপুর থানায় কর্মরত একজন সহকারী উপপরিদর্শক ও একজন কনস্টেবল প্রার্থীর সঙ্গে অধিকাংশ সময় থাকছেন বলে জানা গেছে। মঠবাড়ী ইউনিয়নে এক রাতের উঠান বৈঠকে দায়িত্ব পালনকালে তারা জানান, সকালে প্রার্থীর বাসায় খাবার খাওয়া থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত তাঁর সঙ্গেই থাকতে হয় এবং রাতে থানায় অবস্থান করেন।
পুলিশি উপস্থিতির সিদ্ধান্ত কোথা থেকে এসেছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। রাজাপুর থানার ওসি জরুল ইসলাম মৃধা বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে পুলিশ প্রার্থীর সঙ্গে রয়েছেন। এ বিষয়ে প্রার্থীর কোনো আবেদন ছিল না এবং রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষ থেকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে পুলিশ চাইলে এ ধরনের নিরাপত্তা দিতে পারে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট প্রার্থী পুলিশি নিরাপত্তার জন্য কোনো আবেদন করেননি এবং পোশাকধারী পুলিশ দিয়ে নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়ে কোনো লিখিত নথিও নেই। আইন অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমোদন ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকে এ ধরনের সুবিধা দেওয়া যায় না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশালের সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী পুলিশ ও প্রশাসনের দায়িত্ব সব প্রার্থীর জন্য সমান পরিবেশ নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের সময় দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা একটি প্রতীক তৈরি করে। সেটি যদি একতরফা হয়, তাহলে সমান সুযোগের প্রশ্ন উঠবেই।’
পুলিশি প্রহরা প্রসঙ্গে প্রার্থী ফয়জুল হক বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই এবং তিনি কোনো মামলার বাদীও নন। তফসিল ঘোষণার পর থেকে দুইজন অস্ত্রধারী পুলিশ তাঁর সঙ্গে রয়েছেন বলে জানান তিনি। গ্রামের সব সড়কে গাড়ি চলাচল সম্ভব না হওয়ায় পুলিশের মোটরসাইকেলে যাতায়াত করতে হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ঝালকাঠীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. কাওছার হোসেন জানান, রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরের নথি অনুযায়ী প্রার্থী পুলিশি সহযোগিতার জন্য কোনো আবেদন করেননি। তফসিল ঘোষণার পর অনুমোদন ছাড়া এভাবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভোগ করা আইনসম্মত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে বলে জানান।
সিএ/এএ


