পটুয়াখালী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় ইপিজেডে বালু ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করেই দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে সড়ক, ড্রেনেজসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণকাজ। বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া প্লটগুলোতেই চলতি বছরের শেষ দিকে শিল্পকারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করতে পারবেন বিনিয়োগকারীরা।
বঙ্গোপসাগর ও নদ-নদী পরিবেষ্টিত পটুয়াখালী অঞ্চলের মানুষের জীবিকা দীর্ঘদিন ধরে মাছ ধরা ও কৃষিকাজকেন্দ্রিক। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতকে ঘিরে পর্যটনের বিকাশ ঘটলেও স্থায়ী কর্মসংস্থান ও শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। এই বাস্তবতায় পায়রা সমুদ্রবন্দর, তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ও পদ্মা সেতুর পর দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরে নতুন সংযোজন হিসেবে যুক্ত হচ্ছে পটুয়াখালী ইপিজেড।
পায়রা সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে এলাকায় দুটি এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে রয়েছে। আরও একটি একই ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ এক-চতুর্থাংশ সম্পন্ন হয়েছে। বিদ্যুৎ ও বন্দর সুবিধার সমন্বয়ে পটুয়াখালী ধীরে ধীরে দক্ষিণাঞ্চলের সম্ভাবনাময় শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালে পটুয়াখালী ইপিজেড প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।
সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের পাঁচকোরালিয়া গ্রামে ৪১০ দশমিক ৭৮ একর জমিতে নির্মাণাধীন এ প্রকল্পের বালু ভরাটের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্লট বরাদ্দ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বরাদ্দ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তারা শিল্পকারখানা স্থাপনের কার্যক্রম শুরু করতে পারবেন।
কর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত
দেশের তৃতীয় সামুদ্রিক বন্দর পায়রা সমুদ্রবন্দরের পাশেই গড়ে উঠছে পটুয়াখালী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা। এ কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও ধীরে ধীরে বাড়ছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। উন্নত যোগাযোগ সুবিধার ফলে কম সময় ও কম খরচে কাঁচামাল আমদানি এবং রপ্তানি পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পায়রা বন্দর, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সহজলভ্য শ্রমশক্তির ওপর ভিত্তি করে ইপিজেডে বিভিন্ন ধরনের শিল্পকারখানা স্থাপন করবেন বিনিয়োগকারীরা। এসব কারখানায় প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রত্যেক শ্রমিকের আয়ের ওপর গড়ে আরও দুইজন পরিবারের সদস্য নির্ভর করবেন। সে হিসাবে প্রায় দুই লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইপিজেডকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হবেন।
ইপিজেডে কর্মচাঞ্চল্য বাড়লে আশপাশের এলাকাতেও এর প্রভাব পড়বে। হোটেল-রেস্তোঁরা, গণপরিবহন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানসহ নানা সেবামুখী ব্যবসার প্রসার ঘটবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইপিজেড চালু হলে এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। মাছ ধরা ও কৃষিকাজে নির্ভরশীল দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের একটি বড় অংশ তখন গার্মেন্টস, ম্যানিকুইন হেড ও উইগ, লাগেজ, গাড়ির সিট হিটার, সার্জিক্যাল গাউন, প্লাস্টিক পণ্যসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্পে কাজের সুযোগ পাবেন।
অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সুবিধা
এক হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন পটুয়াখালী ইপিজেডে মোট ৩০৬টি শিল্প প্লট থাকবে। এর মধ্যে এক হাজার ১০৫ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এবং বাকি ৩৩৮ কোটি টাকা বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩ দশমিক ১৫ লাখ মিটার সড়ক, ৩০ হাজার মিটার ড্রেনেজ, চারটি ছয়তলা কারখানা ভবন, তিনটি দশতলা অফিস ভবন, আবাসিক ভবন, কাস্টমস ও জোন অফিস, নিরাপত্তা অফিস এবং একটি হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি জমিদাতা ১৫৪ পরিবারের জন্য পুনর্বাসন আবাসন নির্মাণ করা হচ্ছে, যেখানে পুকুর, মসজিদসহ মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১৪টি সাবস্টেশন, ১৫ কিলোমিটার ১১ কেভি হাই-টেনশন লাইন এবং একটি জিআইএস সাবস্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যুৎ, পানি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজ শেষ হলেই প্লট বরাদ্দ কার্যক্রম শুরু হবে।
জুনে প্লট বরাদ্দ, পরে শিল্পস্থাপন
পটুয়াখালী ইপিজেডের প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘২০২৬ সালের শুরুতে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্লট বরাদ্দ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে দ্রুতগতিতে কাজ চলছে।’ তিনি বলেন, ‘জমিদাতা পরিবারগুলোর আবাসন নির্মাণ শুরু হয়েছে। ড্রেন, ফুটপাত, কালভার্ট ও স্কুলসহ প্রয়োজনীয় সামাজিক অবকাঠামোও গড়ে তোলা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বালু ভরাট শেষে বিভিন্ন স্থাপনার নির্মাণকাজ এখন দৃশ্যমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই বছরের মাঝামাঝি সময় প্লট বরাদ্ধ দেয়া হবে। বিনিয়োগকারীরা এই বছরের শেষের দিকে শিল্প কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করতেন পারবেন।’
পায়রা সমুদ্রবন্দর, পদ্মা সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে পটুয়াখালী ইপিজেড যুক্ত হলে উপকূলীয় অর্থনীতির চাকা নতুন গতিতে ঘুরবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয়দের কাছে এটি কেবল একটি শিল্পাঞ্চল নয়, বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রতীক হয়ে উঠছে।
সিএ/এএ


