দেশের দক্ষিণ উপকূলে এখন ইলিশের মৌসুম। তবে বছর দুয়েক আগেও এই সময়ে ৮০০–৯০০ গ্রামের যে রুপালি ইলিশ জেলেদের জালে উঠত, এ বছর তা কার্যত উধাও। মাঝেমধ্যে ধরা পড়ত দেড় থেকে দুই কেজির বড় ইলিশও; এখন জেলেদের জালে উঠছে মূলত জাটকা আর ছোট আকারের নবীন ইলিশ। সড়কপথে পাচারের সময় কোস্ট গার্ডও নিয়মিত এসব ছোট ইলিশ জব্দ করছে—কয়েক দিনের ব্যবধানে ধরা পড়েছে কয়েক শ মণ জাটকা।
জেলেরা জানান, এবার যে সামান্য বড় ইলিশ মিলছে, তার ওজন গড়ে ৩০০–৩৫০ গ্রাম। সদ্য ডিম ছাড়া, লম্বা-পাতলা গড়নের এসব ইলিশের স্বাদও কম। অনেক সময় জেলেদের জাল ফিরে আসছে একেবারেই ইলিশশূন্য। গত এক দশকে এমন পরিস্থিতি হয়নি বলে দাবি তাদের।
ইলিশের ঘাটতির সুযোগে বাজারে বাড়ছে অন্য সামুদ্রিক মাছের চাহিদা। লাক্ষা, লইট্টা, মাইট্যাসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের দাম এখন চড়া। চাষের মাছের দামও বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে পোল্ট্রি মুরগির দাম। জেলেদের অভিযোগ—নিষেধাজ্ঞার পর গভীর সাগরে গেলেও বড় ইলিশ মিলছে না, তার ওপর বৈরী আবহাওয়ায় ইলিশ আহরণ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বরগুনা ট্রলার মালিক সমিতির তথ্য বলছে, জেলায় নিবন্ধিত জেলে প্রায় ৪৮ হাজার; সহস্রাধিক ট্রলারে কাজ করেন এক লাখ ২০ হাজার জেলে ও শ্রমিক। মা ইলিশ রক্ষা অভিযান শেষের আগে-পরের কয়েক মাস ধরে তাদের মুখে একটাই কথা—সাগরে ইলিশ নেই। টানা লঘুচাপ-নিম্নচাপের কারণে সাগরের পানি অস্থিতিশীল, মালিকরা পড়ছেন লোকসানে।
ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘এখন যে ইলিশ ধরা পড়ছে, তা ছোট এবং সংখ্যায়ও কম। প্রত্যেক ট্রলারই লোকসান করছে। এই অবস্থা কতদিন চলবে, বলা মুশকিল। মাছ না পড়ার পেছনে ট্রলিং ট্রলার দায়ী—এগুলোর কারণেই মাছ বিলীনের পথে।’
পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের সহকারী বিপণন কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার সরকার জানান, মা ইলিশ রক্ষায় ৪–২৫ অক্টোবরের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার পর ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত অবতরণ কেন্দ্রে উঠেছে ৯৯৭ মেট্রিক টন ইলিশ। গত বছর একই সময়ে ছিল এক হাজার ২০৪ মেট্রিক টন—এ বছর প্রায় ২০৭ টন কম, অর্থাৎ ১৮ শতাংশ হ্রাস।
তার ভাষায়, ‘ইলিশ শুধু কমই নয়, আকারেও ছোট। নদীতে ডিম ছেড়ে সাগরমুখী নবীন ইলিশই এখন বেশি ধরা পড়ছে।’ সাগরের ছোট ইলিশ মণপ্রতি বিক্রি হয়েছে ২২–২৩ হাজার টাকায়, আর নদীর ছোট ইলিশ কেজিপ্রতি দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত।
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রায় সব উপকূলেই একই চিত্র। বড় ইলিশ কমে যাওয়ার পেছনে নদী ও সাগরের দূষণ, অক্সিজেনের ঘাটতি, বৃষ্টিপাত কম হওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তন—সব মিলেই দায়ী। সরকারি তথ্য বলছে, চলতি বছর জুলাই–আগস্ট উপকূলজুড়ে আহরিত ইলিশের পরিমাণ ২৯ হাজার ৫১৯ মেট্রিক টন; গত বছর একই সময়ে ছিল ৪০ হাজার ২৯১ টন—এ বছর ১১ হাজার টন কম।
বুধবার সকালে বরগুনার পাথরঘাটায় ফিরেছে আট–১০টি ট্রলার। সাতটিতে ইলিশ মিললেও সবই ছোট—কোথাও ২০০, কোথাও ৫০০টি। এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারে পাওয়া গেছে প্রায় ৫০০টি ছোট ইলিশ। জেলে শয়জদ্দিন মাঝি বলেন, ‘পাঁচ দিন জাল ফেলেছি, ইলিশ খুব কম পেয়েছি। গত বছর এই সময়ে দ্বিগুণ পেয়েছিলাম। নিষিদ্ধ ট্রলিং ট্রলারের কারণেই মাছ কমে গেছে।’
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বলেন, নিষেধাজ্ঞার পর শুরুতে কিছু ইলিশ মিললেও এখন কমে গেছে, আকারেও ছোট। প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, দূষণ, বৃষ্টি কম হওয়া, অতিরিক্ত আহরণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মিলেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বড় ইলিশ কেন কমে যাচ্ছে, জানতে আরও গভীর গবেষণা দরকার।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অনুষদের অধ্যাপক ড. রাজীব সরকার বলেন, বড় ইলিশ কমে যাওয়া এখন একটি স্পষ্ট সংকেত। দূষণ, অক্সিজেনের ঘাটতি, কম বৃষ্টি ও জলবায়ুর প্রভাব ইলিশের বৃদ্ধি ও প্রাপ্যতাকে হুমকিতে ফেলছে। এতে জেলেদের জীবিকা সংকটে পড়ছে, বাজারে সরবরাহ কমে দাম বাড়ছে—ভোক্তাও চাপে পড়ছেন। তার মতে, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দূষণ নিয়ন্ত্রণ, প্রজনন মৌসুমে কঠোর ব্যবস্থাপনা এবং ইলিশের আবাসস্থলে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন।
সিএ/এএ


