আরব বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ জর্ডান। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং মানবিকতার মিশেলে দেশটির রমজান মাস এক ভিন্ন আবহ তৈরি করে। আধুনিক নগর জীবনের মধ্যেও কীভাবে ঐতিহ্য ও মানবিকতা ধরে রাখা যায়, জর্ডানের রমজানের বিভিন্ন আয়োজন তারই একটি উদাহরণ।
মাস্তাজেল উদ্যোগ
রমজানের বিকেল নামলেই রাজধানী আম্মানের ব্যস্ত সড়কগুলোতে দেখা যায় এক ভিন্ন দৃশ্য। আসরের নামাজের পর থেকেই কিছু তরুণ-তরুণী বিশেষ জ্যাকেট পরে সড়কে অবস্থান নেন। তাদের হাতে থাকে ছোট ছোট প্যাকেট।
মাস্তাজেল ক্যাম্পেইনের মূল স্লোগান হলো একটি খেজুরের জন্য একটি জীবন হারাবেন না। ইফতারের আগে অনেকেই দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। এই ঝুঁকি কমাতে স্বেচ্ছাসেবকেরা সিগন্যাল পয়েন্টে দাঁড়িয়ে চালকদের হাতে খেজুর ও পানির প্যাকেট তুলে দেন, যাতে তারা রাস্তায় চলন্ত অবস্থাতেই ইফতার করতে পারেন এবং দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।
এই উদ্যোগে শুধু শিক্ষার্থী নয়, পুলিশ সদস্য ও বিভিন্ন পরিচিত ব্যক্তিরাও অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি জর্ডানের একটি সামাজিক শিষ্টাচারে পরিণত হয়েছে।
রমজান কামানের ঐতিহ্য
জর্ডানে ইফতারের সময় ঘোষণা করার অন্যতম ঐতিহ্য হলো রমজান কামান। স্থানীয়ভাবে একে বলা হয় মিদফা আল ইফতার। ১৯৩৮ সালের নথিপত্রে এই কামানের উল্লেখ পাওয়া যায়।
কয়েক দশক বন্ধ থাকার পর ২০১৯ সালে আবার আম্মানের উঁচু পাহাড় জাবাল আল ক্বালা এলাকায় এটি চালু করা হয়। সূর্যাস্তের মুহূর্তে শহর যখন শান্ত হয়ে যায়, তখন কামানের গর্জন এবং প্রাচীন আল হুসাইনি মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি মিলিয়ে এক বিশেষ পরিবেশ তৈরি হয়। এই দৃশ্য দেখতে দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা পাহাড়ে ভিড় করেন।
ইফতারের ঐতিহ্যবাহী খাবার
জর্ডানের ইফতার টেবিলকে স্থানীয়ভাবে সফরা বলা হয়। এখানে ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন খাবারের উপস্থিতি দেখা যায়।
মানসাফ জর্ডানের জাতীয় খাবার। বড় থালায় ভাতের ওপর বিশেষ শুকনো দই জ্যামিদ দিয়ে রান্না করা খাসির মাংস পরিবেশন করা হয়। অতিথিদের হাত দিয়ে এই খাবার খাওয়ার একটি আলাদা ঐতিহ্য রয়েছে।
রমজানে কাতায়েফ নামের একটি মিষ্টি পিঠাও বেশ জনপ্রিয়। এটি প্যানকেকের মতো, যার ভেতরে বাদাম বা পনিরের পুর দিয়ে ভাজা হয়। ইফতারের পর কাতায়েফ ও গরম কফির আড্ডা জর্ডানের রমজানের পরিচিত দৃশ্য।
সম্মান বজায় রেখে সহায়তা
দরিদ্র মানুষের জন্য সহায়তা কার্যক্রমেও জর্ডানে নতুন ধারা দেখা যায়। এখন আর লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নেওয়ার ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন সুক খয়েরি নামে একটি বাজারের ব্যবস্থা করে।
এখানে দরিদ্র পরিবারগুলোকে কুপন দেওয়া হয়। তারা সাধারণ ক্রেতার মতো ট্রলি নিয়ে বাজারে ঘুরে নিজের প্রয়োজনীয় পণ্য নির্বাচন করেন। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই ব্যবস্থা দরিদ্র মানুষের আত্মসম্মান বজায় রাখতে সহায়তা করে।
মুসাহারাতি ও রাতের পরিবেশ
ইফতারের পর জর্ডানের শহর ও গ্রামগুলো যেন নতুন করে জেগে ওঠে। তারাবির নামাজ শেষে রাতভর আড্ডা ও সামাজিক মিলনমেলার পরিবেশ তৈরি হয়।
গ্রাম ও পুরোনো শহরগুলোতে এখনো মুসাহারাতি নামের ব্যক্তিদের দেখা যায়, যারা সাহরির আগে ঢাক বাজিয়ে মানুষকে জাগিয়ে দেন। অনেক সময় তারা পাড়ার বাসিন্দাদের নাম ধরে ডাকেন। ফলে তারা শুধু একজন কর্মী নন, বরং প্রতিটি এলাকার সামাজিক জীবনের একটি অংশ হয়ে উঠেছেন।
সিএ/এমআর


