রমজান মাস আত্মসংযম, সততা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। ইসলামে রোজা শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা থেকে বিরত থাকার নাম নয়; বরং এটি মানুষের চরিত্র ও আচরণকে পরিশুদ্ধ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই রোজা পালনকারীর জন্য মিথ্যা কথা ও মিথ্যার ওপর নির্ভর কাজ বর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা এবং মিথ্যার ওপর নির্ভর কাজ বর্জন করেনি, তার খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই। (সহিহ বুখারি: ১৯০৩)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইবাদত তখনই প্রকৃত অর্থে গ্রহণযোগ্য হয় যখন তা মানুষের স্বভাব ও চরিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। কেউ যদি ইবাদত করে কিন্তু একই সঙ্গে মিথ্যা কথা বলে বা মিথ্যার ওপর জীবন পরিচালনা করে, তাহলে সেই ইবাদতের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
হাদিসে মিথ্যার দুটি দিক উল্লেখ করা হয়েছে—একটি মিথ্যা কথা এবং অন্যটি মিথ্যার ওপর নির্ভর কাজ।
মিথ্যা কথার অর্থ হলো কথাবার্তায় সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ না থাকা এবং বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই এমন কথা বলা। শুধু ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বানিয়ে বলাই নয়, যাচাই না করে কোনো তথ্য প্রচার করাও মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, একজন ব্যক্তির মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তাই বলে বেড়ায়। (সহিহ মুসলিম: ৫)
অর্থাৎ কেউ কোনো তথ্য শুনে সেটি সত্য না মিথ্যা যাচাই না করে অন্যদের কাছে প্রচার করলে সেটিও মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
মিথ্যার ওপর নির্ভর কাজ বলতে বোঝায়—যখন মানুষ মিথ্যাকেই তার কর্মের ভিত্তি বানিয়ে নেয়। যেমন মিথ্যা বা চটকদার স্লোগান দিয়ে নেতৃত্ব অর্জনের চেষ্টা করা, ভিত্তিহীন গল্প বানিয়ে কাউকে অপমান করা, জাল দলিল তৈরি করে অন্যের সম্পদ দখল করা বা অসত্য বক্তব্য দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা করা।
রোজা এমন একটি ইবাদত যার প্রতিদান আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে দান করেন। এতে ত্যাগ, সংযম এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা রয়েছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, মানব সন্তানের প্রতিটি নেক কাজের সওয়াব দশ গুণ থেকে সাত শত গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। মহান আল্লাহ বলেন, কিন্তু রোজা আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব। বান্দা আমারই জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার ত্যাগ করেছে। রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে—একটি ইফতারের সময় এবং অন্যটি তার প্রতিপালক আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়। (সহিহ মুসলিম: ১১৫১)
রোজার বিশেষ মর্যাদার কারণ হলো, এটি মানুষের অন্তর্জগতে গভীর আত্মসমালোচনা ও সংযমের অনুভূতি সৃষ্টি করে। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে এবং আল্লাহর দিকে আরও আন্তরিকভাবে ফিরে আসতে উদ্বুদ্ধ করে।
এই অবস্থায় মানুষের দোয়া আরও আন্তরিক হয়ে ওঠে। সে উপলব্ধি করে যে জীবনের বহু ক্ষেত্রে সে আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ক্ষমা ও রহমতের জন্য তার প্রার্থনা আরও গভীর হয়ে ওঠে।
সিএ/এমআর


