বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারপ্রধানের দপ্তরের অনলাইন কার্যক্রমে পরিবর্তন আনা হয়েছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে পিএমও ডট গভ ডট বিডি ঠিকানাভিত্তিক ওয়েবসাইট থেকে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের জন্য পৃথক ওয়েবসাইট চালু ছিল, যা এখন আর আলাদাভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। পুরোনো ঠিকানায় প্রবেশের চেষ্টা করলে তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে পুনর্নির্দেশ করছে।
তবে ওয়েবসাইটের এই পরিবর্তনের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকাশিত বিভিন্ন নথি, ভাষণ ও দলিল অনলাইনে আর সরাসরি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি তথ্য সাধারণ নাগরিক, গবেষক ও সাংবাদিকদের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে অনুপলব্ধ হয়ে পড়েছে।
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর সরকারপ্রধানের কার্যালয়ের ওয়েবসাইট সরিয়ে নেওয়া একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। অন্তর্বর্তী সরকারও দায়িত্ব গ্রহণের পর তার আগের সরকারপ্রধানের ওয়েবসাইটটি সরিয়ে নিয়েছিল। এবারও সেটিই হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নথিপত্র, ভাষণসহ অন্যান্য সরকারি দলিল আর্কাইভে সংরক্ষিত থাকে এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করলে সেগুলো পাওয়া যাবে।
তবে ওয়েবসাইট বদলের পর নথি অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেভিড বার্গম্যান। তিনি বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার (সাবেক) ওয়েবসাইটটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি তথ্যের ভান্ডার ছিল। সেখানে অধ্যাপক ইউনূসের ভাষণ, নীতিগত ঘোষণা ও সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ দলিল সংরক্ষিত ছিল। সাংবাদিক, গবেষক ও সাধারণ নাগরিক—সবার জন্যই সেগুলো ইন্টারনেটে কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমেই সহজে পাওয়া যেত। এখন ওই তথ্যগুলো অনলাইনে খুঁজে পাওয়া অনেক বেশি কঠিন হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসব নথি শুধু জনগণের জন্যই নয়, সরকারের নিজের প্রয়োজনেও সহজে প্রবেশযোগ্যতা থাকা জরুরি। নতুন সরকারের উচিত, এখন উদ্যোগ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ওয়েবসাইট এবং সেখানে থাকা উপকরণগুলো পুনরায় চালু করার ব্যবস্থা করা।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও একই ধরনের পরিবর্তন হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়েবসাইট পরিবর্তন করে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় করা হয়। পরবর্তী সময়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আগের সরকারের অপ্রয়োজনীয় ও প্রশংসাসূচক তথ্য, ছবি ও ভিডিও বিভিন্ন দপ্তরের ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সে সময় কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে আগের সরকারের বার্ষিক প্রতিবেদনও সরিয়ে ফেলা হয় এবং পরে সেগুলো আর সংযুক্ত করা হয়নি। সম্প্রতি একাধিক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ঘুরে আগের সরকারের সময়কার বার্ষিক প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে কিছু মন্ত্রণালয়ের সাইটে প্রতিবেদনগুলো এখনও পাওয়া যাচ্ছে।
একটি মন্ত্রণালয়ের এক সিস্টেম অ্যানালিস্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিবেদনগুলো আর পাওয়া যাবে না। সেগুলো আর্কাইভ করা হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘চিফ অ্যাডভাইজার জিওবি’ নামে একটি অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ পরিচালিত হতো। সরকার পরিবর্তনের পর প্রথমে পেজটি বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হলেও পরে জানানো হয়, কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ‘ঐতিহাসিক সময়ের দলিল’ হিসেবে পেজটি উন্মুক্ত রাখা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে ওয়েবসাইট পুনর্গঠন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথির ধারাবাহিক সংরক্ষণ ও সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।
সিএ/এমই


