আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের পদ থেকে বিদায়ের দিনেই মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন একই ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। তবে এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন তাজুল ইসলাম। শুক্রবার ( ৫ ডিসেম্বর) শনিবার (৬ ডিসেম্বর) রোববার (৭ ডিসেম্বর)
সোমবার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে ‘ট্রাইব্যুনালে সেটলিং বাণিজ্য ও রাজসাক্ষী নাটক: কেন সরতে হচ্ছে তাজুল ইসলামকে?’ শিরোনামে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। ওই পোস্টে দুটি পৃথক মন্তব্য করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। সেখানে তিনি তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও মামলার প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার অভিযোগ তোলেন।
সুলতান মাহমুদের অভিযোগ, ‘চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে’ টাকা আয়ের হাতিয়ার করেছিল তাজুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন একটি সিন্ডিকেট। তিনি দাবি করেন, আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলার আসামি এসআই শেখ আবজালুল হকের স্ত্রী একদিন সন্ধ্যায় ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রসিকিউটর তামীমের কক্ষে প্রবেশ করেন। বিষয়টি তিনি তাজুল ইসলামকে জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং উল্টো তাঁকে তিরস্কার করা হয়। পরবর্তী সময়ে ওই এসআইকে রাজসাক্ষী করা হয় এবং বিচারে খালাস দেওয়া হয় বলে মন্তব্যে উল্লেখ করেন তিনি।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করা হয়। রায়ে ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড, সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং দুজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই রায়ে ‘অ্যাপ্রুভার’ আশুলিয়া থানার সাবেক উপপরিদর্শক শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করা হয়।
এ ছাড়া চানখাঁরপুল এলাকার একটি মামলায় এসআই আশরাফুল গুলি করার নির্দেশনা দিচ্ছেন—এমন ভিডিও থাকার দাবি করে তাঁকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন সুলতান মাহমুদ। রংপুরে শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের মামলায় এসি ইমরানকে অব্যাহতি দেওয়া এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল–মামুনকে রাজসাক্ষী করার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল–১। একই রায়ে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল–মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যিনি ওই মামলায় অ্যাপ্রুভার ছিলেন।
রাতে মুঠোফোনে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ বলেন, তিনি যা বলেছেন তার প্রমাণ তাঁর কাছে রয়েছে।
অন্যদিকে নিয়োগ বাতিলের পর ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে হচ্ছে কে কী অভিযোগ করছে, এগুলো আমরা আমলে নিচ্ছি না। ব্যক্তিগতভাবে ক্ষোভ থেকে কে কী বলছে, সে ব্যাপারে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই।’
এসআই আবজালুল হকের স্ত্রীর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘না, এটা আমার জানা নেই।’ পরে আরও বলেন, ‘এই জাতীয় অভিযোগ আমরা তদন্ত করে দেখেছি, এগুলো সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা। ব্যক্তিগত হিংসা চরিতার্থ করার জন্য যদি কেউ এই ধরনের কথা বলেন, এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কারণ, এইখানে ট্রাইবুনালে বিচারপ্রক্রিয়াতে যা কিছু হয়েছে ট্রান্সপারেন্ট (স্বচ্ছ) এবং সেটা আদালতের মাধ্যমে কিন্তু প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং আজকে এই মুহূর্তে যদি কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো মিথ্যা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের গোটা জনগণ সাক্ষী, মিডিয়া সাক্ষী। আপনারা জানেন যে কী ধরনের ট্রান্সপারেন্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। কারণ, দু–একজনের ব্যক্তিগত ক্ষোভের থেকে সে বুঝে হোক, না–বুঝে হোক যদি বলে, সেগুলোকে আমরা ধর্তব্যের মধ্যে মনে করি না।’
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নতুন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে মো. আমিনুল ইসলামকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি যে এই জাতীয় বিষয় যদি আজকে আমাকে না বলেন, মনে হয় ভালো হবে। আজকের দিনটা আমাকে একটু অব্যাহতি দেবেন। কারণ, আজকে একেবারেই আমি আপনাদের মেহমান। প্রথম দিন। আমি এই কথাগুলো একেবারেই এখন নিতে চাচ্ছি না।…আপনি যে কথাগুলো বললেন, যদি এ রকম কিছু হয় নিশ্চয় আমার কাছে আসবে। তখন এগুলো দেখা যাবে। আজকে এই প্রশ্নগুলো না করি।’
সিএ/এমই


