কুড়িগ্রাম পৌরসভার সবুজ পাড়ায় বসে ভাষা আন্দোলনের দিনগুলোর স্মৃতি তোলেন ভাষাসৈনিক এ কে এম সামিউল হক নান্টু। একসময় পুলিশের খাতায় তিনি ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অপরাধে অনেকদিন বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। মিছিলে গিয়ে পুলিশের লাঠিপেটার শিকারও হয়েছেন। অথচ আজ তিনিই কুড়িগ্রামের মানুষের কাছে ভাষাসৈনিক সম্মানের প্রতীক।
সামিউল হক নান্টু ৩০ নভেম্বর ১৯৪০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথে যাঁরা সোচ্চার ছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনি বেঁচে থাকা কয়েকজনের একজন। বয়সের ভার সত্ত্বেও ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি তাকে আজও উদ্দীপ্ত করে।
১৯৪৮: ধর্মঘটের ডাক, কুড়িগ্রামে সাড়া
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পূর্ব বাংলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের আহ্বান জানায়। ঢাকার আন্দোলনের ঢেউ কুড়িগ্রামে পৌঁছায়। কুড়িগ্রাম হাইস্কুল ও অন্যান্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ধর্মঘটে অংশ নেন। সামিউল হক তখন কুড়িগ্রাম জুনিয়র হাইস্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। ছোট বয়সেই আন্দোলনের আবহ তাঁকে রাজপথে টেনে নেয়।
২১-২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: উত্তেজনা ও ধর্মঘট
২১ ফেব্রুয়ারি কুড়িগ্রামে ছাত্রদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলেও ঢাকায় পুলিশের গুলিতে শিক্ষার্থীরা নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদের গোপন বৈঠকে ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সামিউল হকও ওই মিছিলে অংশ নেন। মিছিলে ছাত্ররা কালো ব্যাজ পরেন এবং খালি পায়ে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করেন। এ সময় মুসলিম লীগ নেতা ও পুলিশের হস্তক্ষেপে সামিউল হকসহ কয়েকজনকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
কুড়িগ্রামের প্রথম শহীদ মিনার
১৯৫২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কুড়িগ্রাম-ভূরুঙ্গামারী সড়কসংলগ্ন খেলার মাঠে কাদামাটি দিয়ে জেলার প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। পুলিশ সেটি ভেঙে দিলেও শিক্ষার্থীরা রাতেই পুনর্নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে ইট ও সিমেন্ট দিয়ে পুনর্নির্মাণ করা হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এটি ধ্বংস হলেও স্বাধীনতার পর পুনর্নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে মিনারটি কুড়িগ্রাম পৌর শহরের মোল্লাপাড়ায় মজিদা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের প্রাঙ্গণে অবস্থিত।
অবহেলা ও উপেক্ষা
নতুন শহীদ মিনার থাকায় জেলার প্রথম শহীদ মিনারটি এখন অনেকটাই উপেক্ষিত। মূল বেদির আশপাশে ময়লা, দেয়ালের পেছনে মূত্রত্যাগের চিহ্ন ও পড়ে থাকা নেশাজাতীয় বোতল দেখা যায়। কলেজের অনেক শিক্ষার্থীও জানে না এটি জেলার প্রথম শহীদ মিনার। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেছেন, কলেজ কর্তৃপক্ষকে প্রথম শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর নির্দেশ দেওয়া হবে।
‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ থেকে সম্মানিত ভাষাসৈনিক
ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে একসময় ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়া সামিউল হক নান্টু আজ কুড়িগ্রামের গর্ব। তিনি বলেন, ‘ভাষার জন্য রাজপথে নামা ছিল আমাদের অধিকার। ভয় ছিল, তবু পিছু হটিনি।’ কুড়িগ্রামের প্রথম শহীদ মিনার শুধুমাত্র একটি স্থাপনা নয়, এটি এক প্রজন্মের সাহস, প্রতিবাদ ও আত্মত্যাগের স্মারক। সামিউল হক নান্টুর জীবনকথা প্রমাণ করে, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষকে ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সম্মানিত করে।
সিএ/এমই


