ইফতারের টেবিলে ফল অনেকের কাছে অপরিহার্য অনুষঙ্গ। কিন্তু পবিত্র রমজানের শুরুতেই চট্টগ্রামের বাজারে আপেল, কমলা ও আঙুরের মতো জনপ্রিয় ফলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতারা পড়েছেন চাপে। পাইকারি থেকে খুচরা—দুই স্তরেই দাম বেড়েছে, ফলে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ফল কেনা কঠিন হয়ে উঠছে।
শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) নগরের স্টেশন রোডের ফলমন্ডির পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার আপেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২৭০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ২৪০ টাকা। চীনের কমলার দাম ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৮০ টাকা। আঙুরের দাম আরও বেশি। চীনের লাল আঙুর ৪২০ টাকা, কালো ৫৫০ টাকা এবং সাদা ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন জাতের ফলে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। মিসরের মাল্টা ২৬০ টাকা ও চীনের মাল্টা ২২৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
পাইকারি ফল বিক্রেতা মোহাম্মদ হান্নান বলেন, রোজার শুরুতে দাম কিছুটা বাড়তি থাকে। গত কয়েক বছরও একই চিত্র দেখা গেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে সম্প্রতি কর্মবিরতি চলেছে। এতে পণ্য খালাস বন্ধ ছিল। বিদেশি ফলের অনেক জাহাজ আটকে ছিল। এখন প্রতিদিন খালাস হচ্ছে। শিগগিরই দাম কমে যাবে।
পাইকারি বাজারের সঙ্গে খুচরা বাজারের দামের ব্যবধান ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। নগরের ২ নম্বর গেট, প্রবর্তক মোড়, হামজারবাগ, কর্নেলহাট ও স্টেশন রোড এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কমলা প্রতি কেজি ৩৬০ টাকা, আপেল ৩৮০ টাকা, কালো আঙুর ৬৫০ টাকা, লাল আঙুর ৫০০ টাকা এবং মাল্টা ৩৩০ থেকে ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
হামজারবাগে ফল কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘রোজায় বাচ্চারা ফল চায়। কিন্তু এক কেজি ভালো আঙুর কিনতে গেলেই ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লাগে। সব ফল একসঙ্গে কেনা যায় না। তাই কম কিনছি।’
খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, পাইকারি বাজারেই দাম বেশি থাকায় খুচরা পর্যায়ে তা আরও বাড়ে। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, দোকানভাড়া, শ্রমিকের মজুরি এবং পচনশীল পণ্যের ঝুঁকি যুক্ত হয়। কর্নেলহাটের ফল ব্যবসায়ী আবদুল হান্নান বলেন, ‘ফল বেশি দিন রাখা যায় না। নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই কিছুটা বেশি রাখতে হয়। পাইকারির সঙ্গে ১০০ টাকা ব্যবধান মানেই, পুরোটা লাভ নয়। লাভ সীমিত।’
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, রোজায় চাহিদা বাড়ে বলেই দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হয়। তবে প্রতিদিন ফলের চালান আসছে। কয়েক দিনের মধ্যে দাম কিছুটা সমন্বয় হতে পারে।
দেশে প্রায় ৩৮ ধরনের ফল আমদানি হয়। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশই আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর ও আনার। বাকি অংশে রয়েছে নাশপাতি, কিউই, অ্যাভোকাডো ও রাম্বুটানসহ অন্যান্য ফল। ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ডলার সংকট ও শুল্ক-কর বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে বাজারে।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারদর, ডলারের বিনিময় হার ও শুল্ক-কর কাঠামো—এই তিন বিষয় আমদানি করা ফলের দামে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফল অনেক দিন ধরেই বিলাস পণ্য। শুল্ক-কর প্রায় ১২৩ শতাংশ। অর্থাৎ এখন এক কেজি আপেলে প্রায় ১২০ টাকা শুল্ক-কর দিতে হয়। এটি কমানো গেলে বাজারদরও কমতে পারে।
খুচরা বাজারে পাইকারির তুলনায় দামের বড় ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভোক্তা অধিকারকর্মীরা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, মৌসুমি চাহিদাকে কেন্দ্র করে অযৌক্তিক মুনাফার প্রবণতা তৈরি হয়। বাজার স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর তদারকি দরকার। এবারও ফলের দাম বেড়ে গেছে। ফলে পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান বেশি হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সিএ/এমই


