মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার রফিকনগর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত ভাষাশহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর বই ও স্মৃতিচিহ্নে সমৃদ্ধ হলেও সেখানে নিয়মিত পাঠক ও দর্শনার্থীর উপস্থিতি খুবই কম। স্থানীয়দের ভাষ্য, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বহনকারী এই স্থাপনাটি যথাযথ পরিচর্যা ও প্রচারের অভাবে প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছে না।
জেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার এবং সিঙ্গাইর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে পারিল গ্রামে ২০০৮ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ও জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে গ্রন্থাগার ও জাদুঘরটি নির্মিত হয়। ভাষাশহীদের নামে গ্রামের নামকরণ করা হয় রফিকনগর। জাদুঘর নির্মাণে জমি দান করেন শহীদ রফিকের প্রতিবেশী কর্নেল (অব.) মজিবুল ইসলাম খান।
জাদুঘর ভবন থেকে ২৫০ থেকে ৩০০ গজ দূরেই শহীদ রফিকের পৈতৃক ভিটা। ২০০০ সালে প্রশিকা মানবিক উন্নয়নকেন্দ্র সেখানে একটি বাসগৃহ নির্মাণ করে দেয়। বর্তমানে সেখানে শহীদ রফিকের ভাই প্রয়াত আবদুল খালেকের পরিবার বসবাস করছে। বাড়ির পাশেই রয়েছে একটি শহীদ মিনার।
বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ভাষা-আন্দোলনের শহীদেরা গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, ১৯২৬ সালে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের পারিল বলধার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রফিক উদ্দিন আহমদ। বাবার প্রেস ব্যবসার কাজে তিনি ঢাকায় থাকতেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মিছিলে অংশ নিতে যাওয়ার আগে তিনি পুরান ঢাকার হাজী ওসমান রোডে ভগ্নিপতি মোবারক আলী খানের বাসায় ছিলেন। সেদিন দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায় পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন। ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন তিনি।
গ্রন্থাগার ভবনের সামনের দেয়ালে শহীদ রফিকের একটি ম্যুরাল রয়েছে। ভেতরে তাঁর দুটি ছবি টাঙানো আছে। গ্রন্থাগারে ১০টি আলমারিতে সংরক্ষিত রয়েছে প্রায় ১৬ হাজার বই, যার বেশির ভাগই বাংলা একাডেমি থেকে সরবরাহ করা। তবে ভাষাশহীদদের নিয়ে লেখা বইয়ের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। গ্রন্থাগারিকের দায়িত্বে থাকা ফরহাদ হোসেন জানান, তিনি সহ তিনজন এখানে কাজ করেন, কিন্তু তাঁদের চাকরি এখনো স্থায়ী হয়নি এবং বেতনও সীমিত।
জাদুঘরে শহীদ রফিকের ব্যবহৃত লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি সংরক্ষিত আছে। এছাড়া তাঁর পরিবারের ব্যবহৃত চারটি চেয়ার, একটি টেবিল, একটি টেবিল ক্লথ এবং ২০০০ সালে পাওয়া একুশে পদকের সম্মাননা স্মারকও প্রদর্শিত হচ্ছে। দর্শনার্থী মোহসীন মোহাম্মদ মাতৃক বলেন, ‘কয়েক বছর আগে একবার এখানে এসেছিলাম। এবার এসে ভাষাশহীদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখে ভালোই লেগেছে।’
জাদুঘরের দেখভালকারী মো. শাহজালাল জানান, এলাকার ছাত্রছাত্রীরা মাঝে মাঝে ভাষাশহীদের ব্যবহৃত পাঞ্জাবি, লুঙ্গি ও আসবাবপত্র দেখতে আসে। তবে শহীদ রফিকের ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘এটার নাম জাদুঘর হলেও জাদুঘরে কী কী থাকার কথা তা সরকার এবং আমরাও বুঝি। জাদুঘরে যা থাকার কথা, তা নেই। দর্শনার্থীরা এলেও তেমন কিছু না থাকায় আগ্রহ হারিয়ে চলে যান।’
স্থানীয়দের মতে, যথাযথ প্রচার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নিয়মিত সাংস্কৃতিক আয়োজন না থাকায় গ্রন্থাগার ও জাদুঘরটি প্রত্যাশিত প্রাণচাঞ্চল্য পাচ্ছে না।
সিএ/এমই


