মহান শহীদ দিবসকে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁওয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশের সড়কজুড়ে আঁকা হয়েছে বর্ণিল আলপনা। ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠে অবস্থিত শহীদ মিনারে যাওয়ার পথজুড়ে ছোট–বড় সবার অংশগ্রহণে এই আয়োজন যেন রূপ নিয়েছে এক মিলনমেলায়।
শুক্রবার ( ৫ ডিসেম্বর) দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, শহীদ মিনার ধোয়ামোছার কাজ চলছে। পাশের পিচঢালা সড়কে রংতুলি হাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিশু–কিশোর থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ। কেউ তুলির আঁচড়ে নকশা ফুটিয়ে তুলছেন, কেউ আবার রঙের বিন্যাসে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ ও কমলা রঙে ধীরে ধীরে সড়কজুড়ে ফুটে ওঠে একুশের আলপনা। অনেকেই কাজের ফাঁকে স্মৃতিবন্দি করতে সেলফি তুলতেও ব্যস্ত ছিলেন।
২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে প্রথমবারের মতো শুরু হয় একুশের আলপনা আঁকার উদ্যোগ। সে সময় শহরের চিত্রশিল্পী, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন এ আয়োজনে। সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এটি উৎসবে পরিণত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর মহান শহীদ দিবস উপলক্ষে আলপনা আঁকার এই আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
শহরের চিত্রশিল্পী কাদিমুল ইসলাম বলেন, ‘একুশের প্রথম প্রহরে খালি পায়ে হাঁটার সময়টায় পিচঢালা সড়ক আলপনাবিহীন, এমনটা ভাবা যায় না। পথের বুকে আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে আমাদের, পথের এই আলপনায় ফুটে ওঠে সেই আবেগ, সেই স্মৃতি; শোককে শক্তিতে পরিণত করার সেই অনুভূতি। এই অনুভূতি থেকেই সবার হাতের ছোঁয়ায় একুশের আলপনা জীবন্ত হয়ে ওঠে।’
রংপুরে পড়াশোনা করা নুসাইবা সামিয়া ছুটিতে বাড়ি এসে যোগ দিয়েছেন আলপনা আঁকায়। তিনি বলেন, ‘যাঁদের জন্য আমরা বাংলা ভাষা পেয়েছি, তাঁদের স্মরণে এই আলপনা।’
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহফুজা মারিয়া মারজান রঙে রঙিন মুখে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি। আমার ভাইদের আমরা ভুলিনি। আজ তাঁদের আলপনা এঁকে স্মরণ করছি, কাল ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাব।’
ওয়ার্ল্ড প্লাস রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ জাকির হোসেন পরিবারসহ অংশ নেন এ আয়োজনে। তাঁর স্ত্রী রোকসানা আক্তার মেয়ে সিদরাতুন মুনতাহাকে নিয়ে আলপনা আঁকছিলেন, আর তিনি দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন। জাকির হোসেন বলেন, ‘প্রতিবছর আমি পরিবারের সবাইকে নিয়ে এই আলপনা আঁকায় আয়োজনে যোগ দিই। যখন আলপনায় তুলির আঁচড় দিই, তখন শহীদদের মুখটা ভেসে ওঠে।’
সড়ক দিয়ে রিকশা নিয়ে যাওয়ার সময় আলপনা আঁকা দেখে নেমে পড়েন চালক শহিদুল ইসলাম। একটি রঙের কৌটা ও তুলি হাতে নিয়ে তিনিও যুক্ত হন কাজে। তাঁর ভাষ্য, শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণ করতেই তিনি আলপনায় অংশ নিয়েছেন।
আয়োজনটির তদারকিতে থাকা রাকিবুল আলম জানান, একুশের চেতনা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখানে অংশগ্রহণকারীদের কেউ পেশাদার শিল্পী নন; ভাষাশহীদদের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হয়েছেন।
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নাজমুল হক বলেন, একুশের সঙ্গে আলপনার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে আলপনা আঁকার আয়োজন করতে জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নেবে।
সিএ/এমই


