মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার টিকরপাড়া গ্রামে হেলিকপ্টারে চড়ে এলেন চীনের এক কনে। বৃহস্পতিবার ( ৫ ডিসেম্বর) বিকেল চারটার দিকে কামারচাক ইউনিয়নের ওই গ্রামে কনেকে নিয়ে হেলিকপ্টার অবতরণ করলে কৌতূহলী মানুষের ঢল নামে আশপাশের এলাকা থেকে। গ্রামের মেঠোপথ ও খোলা মাঠজুড়ে নারী-পুরুষ ও শিশুসহ নানা বয়সী মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায়।
পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা থাকলেও খবর ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামগুলোতেও। টিকরপাড়ায় এই প্রথম কোনো হেলিকপ্টার অবতরণ করায় স্থানীয়দের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। পাশাপাশি ভিনদেশি কনেকে এক নজর দেখতে সকাল থেকেই উৎসুক ছিলেন অনেকে।
বর সুকান্ত সেন টিকরপাড়ার সেন বাড়ির প্রয়াত স্বপন কুমার সেন ও শিল্পী রানি সেনের ছেলে। কনে চীনের সাংহাইয়ের বাসিন্দা ক্রিস হোয়ে। বিকেল চারটার দিকে ধুলা উড়িয়ে মাঠে অবতরণ করে হেলিকপ্টার। সুকান্ত, ক্রিস হোয়ে ও তাঁর মা হেলিকপ্টার থেকে নামেন। এরপর তাঁদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয় এবং প্রদীপ জ্বালিয়ে বর-বধূকে ঘরে প্রবেশ করানো হয়।
এর আগে দুপুর তিনটার পর থেকেই বাড়ির সড়ক ও আশপাশের অলিগলি সাদা ও রঙিন কাপড়ে সাজানো হয়। বাড়ির দক্ষিণ পাশের মাঠে লাল পতাকা টাঙিয়ে হেলিকপ্টার অবতরণের ব্যবস্থা করা হয়। পুলিশ সদস্য ও স্বজনেরা মাঠসংলগ্ন স্থানে অবস্থান নেন। সাড়ে তিনটার আগেই বিভিন্ন দিক থেকে মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন।
পাশের গ্রাম চাটিগাঁও থেকে আসা সুপ্রভা দে (৭৫) বলেন, ‘এর আগে আর হেলিকপ্টার–বিমান দেখছি না। এলাকায় এ রকম ঘটনা এর আগে আর ঘটছে না।’ একই গ্রামের শর্মি ধর বলেন, ‘দূরদেশ থেকে বউ আসছে। দেখতে আসছি। এই প্রথম এ রকম বিয়ে দেখছি। অনেক ভালো লাগছে।’
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর শেষে প্রায় আট বছর আগে সুকান্ত সেন চীনে যান। পরে সাংহাই মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি থেকে আরেকটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। চাকরির পর আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা শুরু করেন তিনি। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি চীনে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। ব্যবসায়িক সূত্রে পরিচয়ের পর সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হয়।
ক্রিস হোয়ে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তাঁর আগ্রহ ও সম্মতিতে হিন্দুধর্মীয় রীতিতে আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্য এ আয়োজন করা হয়েছে। শুক্রবার (৬ ডিসেম্বর) ক্রিস হোয়ের বাবা ও চাচা গ্রামে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সুকান্ত সপ্তাহ দুয়েক আগে দেশে ফিরেছেন এবং ঢাকায় গিয়ে কনে ও তাঁর মাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে হেলিকপ্টারে গ্রামে নিয়ে আসেন।
সুকান্ত সেন বলেন, ‘আমার দেশের বাইরে বিয়ে করার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কেউ হয়তো আমাদের সংযোগ ঘটিয়ে দিয়েছে। আমি তিন বছরের বেশি সময় ধরে তাঁকে জানি। সবকিছু মিলিয়ে আমি খুব খুশি, সে–ও খুশি।’
ক্রিস হোয়ে বলেন, ‘আমার দ্বিতীয়বার বাংলাদেশে আসা। সবাই বন্ধুভাবাপন্ন। সবাই উষ্ণ অভ্যর্থনা দিয়েছে। হেলিকপ্টারে আসাটা ব্যতিক্রমী। আমার জন্য খুবই উপভোগ্য হয়েছে।’
পরিবার জানিয়েছে, ২১ ফেব্রুয়ারি গায়েহলুদ, ২২ ফেব্রুয়ারি বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা এবং ২৪ ফেব্রুয়ারি বৌভাতের আয়োজন করা হয়েছে। আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসীকে নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সুকান্তের বোন ঐশী সেন, যিনি সাংহাই মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন, বলেন, ‘সে (ক্রিস হোয়ে) খুবই আন্তরিক। অল্প সময়ে আমাদের খুবই আপন করে নিয়েছে। সে নিজেই চাইছিল এ রকম প্রথামতো বিয়ে হোক।’
বরের জ্যাঠাতো ভাই আশিস কুমার সেন বলেন, ‘এই বিয়েতে আমরা খুশি। আমরা সব সময় যার যার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিই। যে যার সঙ্গে ইচ্ছা সংসার করে ভালো থাকবে, সে রকমই হওয়া উচিত।’
কামারচাক ইউনিয়নের শিক্ষক ও কবি জয়নাল আবেদীন (শিবু) বলেন, দুই সংস্কৃতির মানুষের এই সম্পর্ক ইতিবাচক বার্তা বহন করে এবং এতে সংস্কৃতির আদান-প্রদান হবে।
কনেকে নামিয়ে হেলিকপ্টার চলে যাওয়ার পরও বাড়িতে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। উপস্থিত লোকজনকে মিষ্টিমুখ করানো হয়। ভিনদেশি ক্রিস হোয়ে ততক্ষণে সেন পরিবারের নতুন সদস্য হিসেবে সবার সঙ্গে মিশে যান।
সিএ/এমই


