চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের ফাটাপাড়া এলাকায় শনিবার ভোরে একটি বাড়িতে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও তিনজন। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ–৩ আসনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী হারুনর রশীদ।
পুলিশ জানায়, নিহত দুজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আহত ব্যক্তিরা হলেন সদর উপজেলার মো. শুভ (২২), চরবাগডাঙ্গা গ্রামের মিনহাজ উদ্দিন (৩০) ও বজলুর রহমান (২০)। তাঁদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বিস্ফোরণের পরপরই পুলিশ, সিআইডির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল, র্যাব, বিজিবি ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও তল্লাশি কার্যক্রম শুরু করে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস।
ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান সাংবাদিকদের বলেন, ফাটাপাড়ার কালামের বাড়ির একটি ঘরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই দুজন নিহত হন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বোমা তৈরির সময় এ বিস্ফোরণ ঘটে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বিস্ফোরণে ঘরের একটি অংশ ধসে পড়েছে। চালের টিন দুমড়ে-মুচড়ে আশপাশে ছড়িয়ে আছে। একটি টিন উড়ে গিয়ে পাশের একটি মেহগনিগাছের ওপরে আটকে রয়েছে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় বাড়ির প্রাচীরেও ফাটল দেখা গেছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৃহস্পতিবার ভোটের দিন রাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সমর্থকেরা এলাকায় মিছিল বের করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই মিছিল থেকে ধানের শীষ প্রতীকের সমর্থক ইউপি সদস্য মো. নাসিরের বাড়িসহ কয়েকটি বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। পরে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
শুক্রবার বিকেলে মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় জামায়াত সমর্থক শরিফুল ও আরেকজনকে মারধরের ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয়রা জানান। সন্ধ্যার পর বিষয়টি মীমাংসা হয় বলেও দাবি করেন তাঁরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, যে বাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটেছে, সেটি কালামের। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা মো. দুলালের ভাই। দুলাল বরখাস্ত চেয়ারম্যান ও একাধিক হত্যা মামলার আসামি শহীদ রানা ওরফে টিপুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, এলাকায় ত্রাস সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সেখানে ককটেল তৈরি করা হচ্ছিল। বিস্ফোরণের সময় বিকট শব্দে আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলমান।
দুপুরের দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে বিএনপির প্রার্থী হারুনর রশীদ অভিযোগ করেন, ভোটের দিন রাতে জামায়াতের মিছিল থেকে বিএনপির সমর্থকদের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। তিনি বলেন, ‘পুলিশের উদ্যোগে ঘটনার মীমাংসা হলেও এলাকায় ত্রাস সৃষ্টির জন্য পলাতক চেয়ারম্যান টিপুর (শহীদ রানা) অর্থায়নে এসব বোমা বানানো হচ্ছিল। এসব ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও জামায়তের লোকজন জড়িত। ঘটনায় যে–ই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা দরকার।’
তবে বিকেলে জামায়াত নেতা লতিফুর রহমান বিএনপি প্রার্থীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘তাঁর মতো (হারুনর রশীদ) দায়িত্বশীল মানুষের এমন বক্তব্য আশা করি না। তিনি এমনটা না বললেই পারতেন। এটা কোনো রাজনৈতিক ঘটনা (বিস্ফোরণে হতাহত) নয়। জামায়াতের লোকজনকে দায়ী করা ঠিক নয়। ধানের শীষের লোকজনের ওপর দাঁড়িপাল্লার লোকজন হামলা করেছে, এটাও ঠিক নয়।’
এ সময় স্থানীয় কয়েকজন তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করেন এবং ধানের শীষের সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করেন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি তিনজনের মুখমণ্ডল ঝলসে গেছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কুমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘তিনজনেরই মুখমণ্ডল ঝলসে গেছে। তবে শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল।’
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শুভর মা ফৌজিয়া খাতুন জানান, তাঁর ছেলে ট্রাক্টরচালক ও নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। পিকনিকের কথা বলে রাত ১০টার দিকে বাড়ি থেকে বের হন। পরে আহত হওয়ার খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে আসেন।
তবে ঘটনাস্থল থেকে ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘এই বাড়িতে কোনো পিকনিক ছিল না। এটা কোনো পিকনিকে হামলা নয়। তাঁরা বোমা তৈরি করছিলেন। তখন বিস্ফোরণ হয়েছে। এতে প্রাচীর ভেঙে গেছে। ঘরের টিন উড়ে গেছে। এমন শক্তিশালী বিস্ফোরণ বোমা তৈরির সময় হয়।’
ডিআইজি আরও বলেন, নিহত দুজন শিবগঞ্জ উপজেলা থেকে ভাড়ায় এসেছিলেন। তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানকার দরিদ্র লোকজন শ্রমিকের কাজ করেন। একদল রাজমিস্ত্রি, আরেক দল বোমা তৈরির মিস্ত্রি। এই কাজটাকে তাঁরা অপরাধ মনে করেন না। এটা সীমান্তের এপার–ওপারের কোনো ব্যবসা কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
সিএ/এমই


