ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোরের ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে বিএনপি। কেবল একটি আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে জয় পেয়েছে দলটি। ফল ঘোষণার পর বিএনপির নেতা–কর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিলেও নিরঙ্কুশ সাফল্যে জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বিএনপির এই ভরাডুবির পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। সেগুলো হলো—প্রাথমিক মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীদের পরিবর্তন করে শেষ মুহূর্তে নতুন প্রার্থী দেওয়া, মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী মাঠে নামাতে না পারা এবং নারী ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের ধর্মীয় প্রচারণার বিপরীতে কার্যকর বিকল্প বয়ান দাঁড় করাতে ব্যর্থ হওয়া।
যশোর-১ (শার্শা) আসনে জামায়াতের মোহাম্মদ আজীজুর রহমান ১ লাখ ১৯ হাজার ৯৩ ভোট পেয়ে ২৫ হাজার ৫৫১ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। বিএনপির প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটন পান ৯৩ হাজার ৫৪২ ভোট। এ আসনে প্রথমে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসানকে প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়া হলেও পরে তা পরিবর্তন করে নুরুজ্জামান লিটনকে চূড়ান্ত প্রার্থী করা হয়। এতে মফিকুলের অনুসারীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয় এবং নির্বাচনী মাঠে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে জামায়াতের মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৬৫ ভোট পেয়ে ৩৪ হাজার ৩১৮ ভোটের ব্যবধানে জয় পান। বিএনপির প্রার্থী সাবিরা সুলতানা পান ১ লাখ ৪৬ হাজার ৬৪৭ ভোট। তাঁর নির্বাচনী প্রধান এজেন্ট মুরাদুন-নবী বলেন, মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের পূর্ণ সমর্থন না পাওয়া এবং নারী ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের ধর্মীয় প্রচারণার প্রভাব পরাজয়ের অন্যতম কারণ।
যশোর-৩ (সদর) আসনে বিএনপির অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ২ লাখ ১ হাজার ৩৩৯ ভোট পেয়ে ১৩ হাজার ৮৭৬ ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের আব্দুল কাদেরকে পরাজিত করেন। জামায়াত প্রার্থী পান ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৬৩ ভোট। এ আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল তুলনামূলক কম থাকলেও প্রত্যাশার চেয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়।
যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনে জামায়াতের গোলাম রসুল ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯১২ ভোট পেয়ে ৪৪ হাজার ৯৯৫ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির মতিয়ার রহমান ফরাজীকে পরাজিত করেন। এ আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া টি এস আইয়ুবের মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় তাঁর সমর্থকদের বড় একটি অংশ ভোটের মাঠে সক্রিয় হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ে লাভবান হন জামায়াতের গাজী এনামুল হক। তিনি পান ১ লাখ ৩২ হাজার ৮৭৬ ভোট। বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া শহীদ মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন পান ৮৫ হাজার ৪৫ ভোট এবং শরিক দলের প্রার্থী রশিদ আহমাদ পান ৫৪ হাজার ৮৭৫ ভোট। ভোট বিভাজনের কারণে এ আসনে বিএনপি পিছিয়ে পড়ে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে জামায়াতের মো. মুক্তার আলী ৯১ হাজার ১৮ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন আজাদ পান ৭৯ হাজার ৩২১ ভোট। এখানে প্রাথমিক মনোনয়নপ্রাপ্ত কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণকে শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন করায় তাঁর অনুসারীদের একাংশ সক্রিয় ছিল না বলে স্থানীয়দের দাবি।
বিএনপির যশোর জেলা সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘সারা দেশে যেখানে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় হয়েছে, সেখানে যশোরে এমন পরাজয় কেন ঘটল, তা আমাদের বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, মনোনয়নবঞ্চিত নেতারা মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করেননি। বরং অনেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জামায়াতের পক্ষে কাজ করেছেন, এমন অভিযোগ আমাদের কাছে আছে। এ ছাড়া জামায়াতের ধর্মীয় প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে নারী ভোটাররা জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়েন। মূলত এই দুটি কারণে পরাজয় ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে আমার মনে হচ্ছে।’
সিএ/এমই


