চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র আলগী বাজারে সেনাবাহিনীর ‘মেজর’ পরিচয়ে চাঁদাবাজি করার সময় কামাল হোসেন গাজী (৪৮) নামের এক ধুরন্ধর প্রতারককে আটক করেছে জনতা। ৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার সন্ধ্যায় আলগী বাজারের ‘লাভলী মেডিকেল হল’ নামক একটি ওষুধের দোকানে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাকে হেফাজতে নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সন্ধ্যায় আলগী বাজারের লাভলী মেডিকেল হলের স্বত্বাধিকারী বিমল চন্দ্র দেওয়ান প্রতিদিনের মতো তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করছিলেন। এ সময় জনৈক ব্যক্তি দোকানে প্রবেশ করে নিজেকে সেনাবাহিনীর ‘মেজর’ হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি অত্যন্ত কঠোর ও কর্তৃত্বপূর্ণ সুরে কথা বলতে শুরু করেন এবং দোকানের বিভিন্ন নথিপত্র ও লাইসেন্সে ত্রুটি আছে বলে দাবি করেন। একপর্যায়ে তিনি বিমল চন্দ্র দেওয়ানকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করার ভয় দেখান।
প্রতারক ব্যক্তিটি চতুরতার আশ্রয় নিয়ে বলেন, বাজারের সেনাবাহিনীর একটি টহল দল অবস্থান করছে। যদি এখনই জরিমানা পরিশোধ না করা হয়, তবে বড় ধরনের আইনি ঝামেলা পোহাতে হবে এবং দোকান সিলগালা করা হবে। জীবন ও ব্যবসার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এবং পরিস্থিতির আকস্মিকতায় আতঙ্কিত হয়ে ব্যবসায়ী বিমল চন্দ্র দেওয়ান তাকে নগদ টাকা দিতে রাজি হন। প্রতারক তখন টহল দলের আপ্যায়ন বা খরচ বাবদ ১০ হাজার টাকা এবং নিজের ব্যক্তিগত বকশিশ হিসেবে ১ হাজার টাকা দাবি করেন। উপায়ান্তর না দেখে বিমল চন্দ্র তাকে মোট ১১ হাজার টাকা প্রদান করেন।
টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর ওই ব্যক্তির আচরণ ও চলে যাওয়ার তাড়াহুড়ো দেখে উপস্থিত লোকজনের সন্দেহ হয়। স্থানীয় বাসিন্দা মিজান, সৈকত ও স্মরণ দাশ জানান, বেশ কয়েকদিন আগে পুরো আলগী বাজারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকৃত মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত) পরিচালিত হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তারা লক্ষ করেন যে, মোবাইল কোর্টের নিয়ম অনুযায়ী সাথে ম্যাজিস্ট্রেট বা পর্যাপ্ত ফোর্স থাকার কথা থাকলেও এই ব্যক্তি একাই সব নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছিল।
উপস্থিত স্থানীয় লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে তার পরিচয় নিশ্চিত হতে চাপ দেন এবং সেনাবাহিনীর আইডি কার্ড দেখতে চান। বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে ওই ব্যক্তি অসংলগ্ন ও বিভ্রান্তিকর কথা বলতে শুরু করলে স্থানীয়রা নিশ্চিত হন যে তিনি কোনো সেনা কর্মকর্তা নন, বরং একজন পেশাদার প্রতারক। এরপর উত্তেজিত জনতা তাকে আটকে রেখে পুলিশে খবর দেয়।
খবর পেয়ে হাইমচর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। হাইমচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ নাজমুল হাসান আটককৃত ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত করেছেন।
প্রতারক কামাল হোসেন গাজী (৪৮) চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার করইয়া গ্রামের (পরান গাজী বাড়ি) আবদুল গফুর গাজীর ছেলে। তার মায়ের নাম পারুল বেগম। বর্তমানে তিনি চাঁদপুর পৌরসভার নাজির পাড়া এলাকার ‘জাহানারা কটেজ’-এ বসবাস করেন বলে জানা গেছে।
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর আলগী বাজারের সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। ব্যবসায়ীরা জানান, সেনাবাহিনীর মতো একটি সম্মানজনক ও আস্থার বাহিনীর নাম ভাঙিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করা অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ।
হাইমচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ নাজমুল হাসান সংবাদমাধ্যমকে জানান,
“সেনাবাহিনীর ভুয়া পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা ও টাকা হাতিয়ে নেওয়া একটি গুরুতর অপরাধ। আটককৃত কামাল হোসেন গাজীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর অভিযোগের ভিত্তিতে একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। অপরাধী যেই হোক, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কেউ যদি কোনো প্রশাসনিক বাহিনীর পরিচয় দিয়ে ভয়ভীতি দেখায়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে তার পরিচয়পত্র যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রয়োজনে দ্রুত স্থানীয় থানা বা নিকটস্থ পুলিশ ফাঁড়িতে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। বর্তমানে আটককৃত প্রতারক কামাল হোসেন পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন এবং এই প্রতারণা চক্রের সাথে আর কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
শিমুল অধিকারী সুমন , চাঁদপুর
সিএ/জেএইচ


