ওমানের মাসকাটে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বৈঠককে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর সম্ভাব্য ‘ভালো সূচনা’ হিসেবে দেখছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে জানান, আলোচনা শেষে উভয় পক্ষ রাজধানীতে ফিরে আরও পরামর্শ করবে। তবে বৈঠকটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেছে বলে তিনি মনে করেন।
গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসার কথা থাকলেও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার পর তা পিছিয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইরানকে হুমকি দিয়েছেন, সমঝোতা না হলে সামরিক হামলা করা হবে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে নৌবহর, যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছে।
ইরান পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, দেশটির ওপর আঘাত এলে শক্ত জবাব দেওয়া হবে। তেহরান জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও ইসরায়েল তাদের প্রতিরোধের লক্ষ্যবস্তুতে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওমান বৈঠক ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এড়ানোর শেষ সুযোগগুলোর একটি।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ার মধ্যেই মাসকাটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এ পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
ইরান বরাবরই বলছে আলোচনার মূল বিষয় হবে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি। তবে যুক্তরাষ্ট্র চায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থন নিয়েও আলোচনা হোক—এ দুটির বিষয়ে তেহরান স্পষ্ট আপত্তি জানিয়েছে।
ওমান জানায়, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পৃথকভাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা ও দূত জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এসব বৈঠকে কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আলোচনার উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এদিকে দেশটিতে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানে নিহত হয়েছেন হাজারো মানুষ। ওয়াশিংটনভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৮৮৩ জন নিহত এবং ৫০ হাজারের বেশি মানুষ আটক হয়েছেন। সংগঠনটি বলছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। অনেকে মনে করছেন, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের বর্তমান সরকার সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
এই সংকট নতুন করে সামনে এনেছে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সঙ্গে পশ্চিমাদের দীর্ঘদিনের বিরোধ। তেহরান দাবি করে আসছে, তাদের কার্যক্রম শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযোগ—এই কর্মসূচির আড়ালে অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চলছে।
ইরান জানায়, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার তাদের রয়েছে। উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রায় ৪০০ কেজি তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর আহ্বান তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরান বলছে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর তাদের সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, কিছু বিষয়ে ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে তারা খোলা মনে আলোচনা করতে প্রস্তুত। এর মধ্যে আঞ্চলিক ভিত্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের একটি যৌথ কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাবও থাকতে পারে। তবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ করার দাবি তারা ‘সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই গোষ্ঠীগুলোকে ইরান ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ হিসেবে আখ্যা দেয়—যাদের মধ্যে গাজার হামাস, ইরাকের মিলিশিয়া সংগঠন, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতিরা রয়েছে।
ওমানের বৈঠকটি মূলত মিসর, তুরস্ক ও কাতারের মধ্যস্থতায় উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগের অংশ। শুরুতে আলোচনা ইস্তাম্বুলে হওয়ার কথা ছিল, তবে ইরানের অনুরোধে শেষ মুহূর্তে স্থান বদলে ওমান করা হয় এবং আলোচনাকে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়।
সিএ/এসএ


