ঝালকাঠিতে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘কেউ যদি পেশিশক্তি ব্যবহার করে ভোটকেন্দ্র দখল করতে আসে, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের শক্ত হাতে প্রতিহত করতে হবে। ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানো কোনো অপরাধ নয়। মামলা করতে এলে বলবেন, শফিকুর রহমানের নামে মামলা করুন। ভয় দেখিয়ে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার দিন শেষ।’
ঝালকাঠি সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে শুক্রবার বেলা দুইটায় অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বক্তব্যের শেষে তিনি ঝালকাঠি–১ ও ঝালকাঠি–২ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাঁদের হাতে দলীয় প্রতীক তুলে দেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই দেশে আর দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলদারি চলবে না। বিগত শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এই টাকা জনগণের, দেশের মানুষের হক। এই অর্থ উদ্ধারে আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে লড়াই শুরু করব। প্রয়োজনে মুখের ভেতর থেকে পেট পর্যন্ত ঢুকিয়ে হলেও দেশের টাকা আদায় করে আনা হবে। দুর্নীতিবাজদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির বলেন, ‘শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি ঝালকাঠির গর্ব। এই জনপদের সাহসী ও প্রতিবাদী সন্তান ছিল। সে কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, পুরো জাতির গর্বের সন্তান। হাদি দুটি স্বপ্ন বুকে ধারণ করেছিল—একটি আধিপত্যবাদমুক্ত বাংলাদেশ, আরেকটি বৈষম্যহীন ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লড়াই করতে গিয়ে সে জীবন দিয়েছে। ইনশা আল্লাহ, আমরা সরকার গঠন করতে পারলে হাদি হত্যার বিচার অবশ্যই করা হবে।’
ন্যায়বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দাঁড়িপাল্লা হচ্ছে ন্যায় ও ইনসাফের প্রতীক। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে ন্যায় নেই, চলছে শুধু বেইনসাফ। গরিব মানুষ আদালতে গিয়ে বিচার পায় না, নিপীড়িত মানুষ তার অধিকার ফিরে পায় না। নির্যাতিত মা–বোনেরা বছরের পর বছর ঘুরেও বিচার পায় না। এই বেইনসাফের রাজনীতি আমরা আর চলতে দেব না। ইনশা আল্লাহ, সরকার গঠন করতে পারলে বেইনসাফকে চিরতরে মাটিচাপা দেওয়া হবে।’
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশ রক্ষার জন্য যাঁরা জীবন বাজি রেখে কাজ করেন, তাঁরা শপথ নেন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক সময় তাঁরা সম্মান ও ন্যায্য মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হন। আমরা সরকার গঠন করলে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্য বাহিনীর সদস্যদের প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করব, যাতে তাঁরা আরও সাহস ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।’
নারীর নিরাপত্তা বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে মা–বোনদের ইজ্জতের কোনো গ্যারান্টি নেই। আমরা এমন রাষ্ট্র গড়তে চাই, যেখানে একজন নারী ঘরে, বাইরে, কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন। এটি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, এটি জামায়াতে ইসলামীর রাষ্ট্রদর্শনের অংশ।’
জেলা জামায়াতের আমির হাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্যসচিব মাহমুদা মিতু, জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোয়াজ্জেম হোসেন (হেলাল), ঝালকাঠি–২ আসনের প্রার্থী এস এম নেয়ামুল করিম, ঝালকাঠি–১ আসনের প্রার্থী ফয়জুল হক, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান (ইরান) প্রমুখ।
ঝালকাঠির জনসভার পর শুক্রবার বিকেলে পিরোজপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আরেকটি নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির। সেখানে তিনি পিরোজপুরের তিনটি আসনে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের মনোনীত প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে তাঁদের হাতে প্রতীক তুলে দেন।
পিরোজপুরের জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে অতীতের ইতিহাসের কালচার আর চলবে না, অতীত ইতিহাসের ভোটের কালচার আর চলবে না। তোমার ভোট তুমি দেবে, আমারটা আমি দেব। আমারটা আমি দেব, তোমারটাও আমি দেব—এটা আর চলবে না। আগামী দিনে যদি কেউ ভোট চুরির চিন্তা করে অথবা কোনো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চিন্তা করে, যত বড় শক্তি হোক আমরা ছেড়ে কথা বলব না, ইনশা আল্লাহ। অতএব এখন থেকে পাহারা শুরু। আর কোনো চোরকে আমরা ছেড়ে কথা বলব না।’
যুবকদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা যুবকদের কোনো বেকার ভাতা দিতে পারব না। যুবকেরা আপনারা কি চান? কাজ। ইনশা আল্লাহ, আমরা হাতে কাজ তুলে দেব। বেকার ভাতা দিয়ে আমরা আমাদের যুবসমাজকে অপমান করতে চাই না। কারও কাছে আমাদের জুলাই যোদ্ধারা মিছিল করে দাবি করে নাই যে, আমাদের বেকার ভাতা দিতে হবে। তারা সেদিন দাবি করেছিল, আমাদের হাতে আমাদের প্রাপ্য কাজ তুলে দিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ন্যায়–ইনসাফের বাংলাদেশে বিভিন্ন শ্রেণি–পেশায় যাঁরা রাষ্ট্রীয় সেবায় নিয়োজিত আছেন, সরকারি, আধা সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন সংস্থায় যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের সবার বেতন আমরা সমান করতে পারব না। যাঁর যাঁর মর্যাদা অনুযায়ী তাঁকে বেতন–ভাতা দিতে সরকার বাধ্য থাকবে।’
ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘পেছনের কোনো কাসুন্দি নিয়ে এই জাতি আর কামড়াকামড়ি করবে না। এ জাতিকে আর বিভক্ত করার সুযোগ আমরা কাউকে দেব না। “ঐক্যবদ্ধ জাতি, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ”—এটা আমাদের স্লোগান।’
সিএ/এমই


