দেশের নির্বাচনী অনিয়ম এখন আর কেবল ভোটকেন্দ্র দখল বা ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অনিয়ম আরও সূক্ষ্ম, সমন্বিত ও ডেটানির্ভর রূপ নিয়েছে। অ্যাপ, ড্যাশবোর্ড এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডার নির্বাচনী কারচুপির সম্ভাব্য হাতিয়ার হয়ে উঠছে। ফলে বিদ্যমান ডিজিটাল কাঠামোর দুর্বলতাগুলো সংস্কার না হলে ভবিষ্যৎ নির্বাচনও বিশ্বাসযোগ্যতার বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউট প্রকাশিত ‘হাইজ্যাকিং দ্য ভোট: ইনসাইড বাংলাদেশ’স ডেটা–ড্রাইভেন ইলেকশন ম্যানিপুলেশন’ শীর্ষক নীতি প্রতিবেদনে এসব উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে জাতীয় পরিচয়পত্র, পোস্টাল ভোট, নির্বাচনী ফল ব্যবস্থাপনা এবং নির্বাচন–সংক্রান্ত ডিজিটাল সিস্টেমে বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব দুর্বলতা দূর করতে নির্বাচন কমিশনের জন্য বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সুপারিশ দেওয়াই প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য বলে জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই দুর্বলতাগুলো সংস্কার না করা হলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনআস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ প্রধান ফৌজিয়া আফরোজ বলেন, ‘ডিজিটাল ম্যানিপুলেশনের ঝুঁকি সৃষ্টিকারী টুলগুলো একে অন্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নাগরিকদের এনআইডি তথ্য, ওয়েবসাইট ও তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এবং ডিজিটাল সিস্টেম নিয়ে জনসচেতনতা না বাড়ালে আগামী নির্বাচনও এই ঝুঁকির মুখে পড়বে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে ব্যাংক, মোবাইল অপারেটরসহ প্রায় ১৮০টি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তথ্য যাচাইয়ের জন্য এনআইডি ডেটাবেজে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। এতে তথ্যপাচার ও অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ছে। কোনো প্রার্থী বা দল যদি অনুপস্থিত প্রবাসী বা মৃত ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, তাহলে জাল ভোট দেওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রবাসী ভোটের ক্ষেত্রেও আস্থার সংকটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাকে স্বতন্ত্র কোনো সমাধান নয় বরং বিদ্যমান দুর্বল কাঠামোর অংশ হিসেবে বর্ণনা করে বলা হয়েছে, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই পদ্ধতি আস্থার সংকট আরও গভীর করতে পারে।
ডিজিটাল ফলাফল ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। ভোটকেন্দ্রভিত্তিক তথ্য প্রদর্শনের জন্য ব্যবহৃত অ্যাপের নকশা, ডেটা যাচাই প্রক্রিয়া ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যার অভাব থাকায় ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে শুরুতেই সন্দেহ তৈরি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনাকে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ বলেও আখ্যা দেওয়া হয়েছে। স্পষ্ট আইন ও নীতিমালা ছাড়া এ উদ্যোগ ভোটারদের গোপনীয়তা ও আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে মত দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ১৫০টি আসনের ফল বিশ্লেষণ করে তিনটি অস্বাভাবিক প্যাটার্ন চিহ্নিত করা হয়েছে। কোথাও কম ভোটার উপস্থিতির বিপরীতে বিপুল বাতিল ভোট, কোথাও শতভাগ ভোট একজন প্রার্থীর পক্ষে যাওয়া, আবার এক হাজারের বেশি কেন্দ্রে একটি ভোটও বাতিল না হওয়াকে পরিসংখ্যানগত অসংগতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ডিজিটাল সংকট মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের জন্য ১০টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। এর মধ্যে রয়েছে এনআইডি ডেটাবেজের প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল ফলাফল ব্যবস্থাপনায় ‘পাবলিক অডিট ট্রেল’ বাধ্যতামূলক করা এবং সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহারে স্পষ্ট আইনগত কাঠামো প্রণয়ন।
সিএ/এমই


