বিজ্ঞানজগতে সবচেয়ে আলোচিত কাল্পনিক প্রাণীটি কোনো ডাইনোসর বা মহাকাশে পাঠানো কুকুর নয়, বরং একটি বিড়াল। এই বিড়াল একই সঙ্গে জীবিত ও মৃত—এমন একটি কল্পনাভিত্তিক ধারণাই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জটিলতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। ১৯৩৫ সালে অস্ট্রিয়ান নোবেলজয়ী পদার্থবিদ আরউইন শ্রোডিঙ্গার একটি মানস-পরীক্ষার মাধ্যমে এই প্যারাডক্সের ব্যাখ্যা দেন, যা আজ ‘শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল’ নামে পরিচিত।
বিশ শতকের শুরুতে ইলেকট্রন ও ফোটনের মতো অতিক্ষুদ্র কণার আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, এগুলো আমাদের দৈনন্দিন জগতের নিয়ম মানে না। নীলস বোর ও ওয়ার্নার হাইজেনবার্গের কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো কণাকে পর্যবেক্ষণ না করা পর্যন্ত সেটি একই সঙ্গে একাধিক অবস্থায় থাকতে পারে, যাকে বলা হয় সুপারপজিশন। এই ধারণা আইনস্টাইন ও শ্রোডিঙ্গারের মতো বিজ্ঞানীদের কাছে অস্বস্তিকর মনে হয়েছিল।
এই তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা বোঝাতে শ্রোডিঙ্গার একটি কাল্পনিক পরীক্ষার কথা বলেন। একটি সম্পূর্ণ আবদ্ধ ইস্পাতের বাক্সে রাখা হলো একটি জীবিত বিড়াল এবং সামান্য তেজস্ক্রিয় পদার্থ। নির্দিষ্ট সময়ে ওই পদার্থের পরমাণু ভাঙতে পারে বা নাও পারে—দুটোর সম্ভাবনাই সমান। যদি পরমাণু ভাঙে, তবে একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে বিড়ালটি মারা যাবে। আর যদি না ভাঙে, তবে বিড়ালটি বেঁচে থাকবে।
কিন্তু বাক্সটি না খোলা পর্যন্ত কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা অনুযায়ী পরমাণুটি ভাঙা ও না-ভাঙা—দুই অবস্থাতেই থাকে। যেহেতু বিড়ালের ভাগ্য সরাসরি ওই পরমাণুর ওপর নির্ভরশীল, তাই গাণিতিকভাবে বিড়ালটিও একই সঙ্গে জীবিত ও মৃত অবস্থায় থাকে। পর্যবেক্ষণের মুহূর্তে এই অবস্থা ভেঙে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট ফলাফল প্রকাশ পায়, যাকে বলা হয় ওয়েভ ফাংশন কোলাপস।
পরে এই ধারণা থেকেই জন্ম নেয় বহু-বিশ্ব তত্ত্ব। বিজ্ঞানী হিউ এভারেটের মতে, পর্যবেক্ষণের সময় মহাবিশ্ব বিভক্ত হয়ে যায়—একটি মহাবিশ্বে বিড়ালটি মৃত, অন্যটিতে জীবিত। এই সুপারপজিশন ধারণার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে আধুনিক কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রযুক্তি। সাধারণ কম্পিউটারের বিট যেখানে কেবল ০ বা ১ হতে পারে, সেখানে কিউবিট একই সঙ্গে উভয় অবস্থায় থাকতে পারে। ফলে জটিল গণনা মুহূর্তেই সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল তাই কেবল একটি তাত্ত্বিক ধাঁধা নয়, বরং বাস্তবতা ও অনিশ্চয়তার সীমা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার। আজও এই ধারণা বিজ্ঞানী ও গবেষকদের নতুন প্রশ্ন ও সম্ভাবনার পথে এগিয়ে নিচ্ছে।
সিএ/এমআর


