মহাকাশে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নিরাপদ ও টেকসই খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্যেই বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন মহাকাশে গাছ জন্মানোর প্রযুক্তি নিয়ে। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক নাসার সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করছেন প্ল্যান্টস ফর স্পেস (P4S) প্রকল্প। বিশ্বের ১১টি দেশের প্রায় ৪০ জন বিজ্ঞানী এই উদ্যোগে যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের মূল লক্ষ্য চাঁদ ও মঙ্গলে মানুষের খাদ্যের স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
নভোচারীরা মহাকাশে থেকেই তাজা লেটুস পাতার স্বাদ নিতে চান, এমনকি মাঝেমধ্যে স্ট্রবেরির মতো ফল খাওয়ার স্বপ্নও দেখেন। বাস্তবে মহাকাশে গাছ জন্মানো অত্যন্ত জটিল। তবু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে গবেষকেরা নতুন প্রযুক্তি ও পরীক্ষামূলক পদ্ধতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। মহাকাশে গাছ লাগানো মানে শুধু খাবার উৎপাদন নয়, বরং মানুষের বেঁচে থাকার একটি পূর্ণাঙ্গ সহায়ক ব্যবস্থা তৈরি করা।
বিজ্ঞানীরা এই ব্যবস্থাকে বলছেন বায়োরিজেনারেটিভ লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম। গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন সরবরাহ করে, বাতাস পরিষ্কার রাখে, পানি পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে এবং ভবিষ্যতে ওষুধ ও বায়োম্যাটেরিয়াল তৈরির কাঁচামালও দিতে পারে। দীর্ঘ সময় মহাকাশে অবস্থান করলে মানসিক চাপ বাড়ে, সেখানে সবুজ গাছপালা নভোচারীদের মানসিক স্বস্তিও দিতে পারে। ফলে গাছ শুধু খাদ্যের উৎস নয়, মহাকাশে মানুষের টিকে থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন।
পৃথিবীর বাইরে চাষাবাদে বড় বাধা হলো ভিন্ন মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশ। মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে পানি ও পুষ্টি উপাদান শিকড়ে ঠিকভাবে পৌঁছাতে চায় না এবং বাতাস চলাচলের স্বাভাবিক নিয়মও সেখানে কার্যকর হয় না। এতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে এবং গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখন গবেষণা করছেন, পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ছাড়া গাছ কীভাবে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
চাঁদে এর আগে সীমিত পরিসরে গাছ জন্মানোর উদাহরণও রয়েছে। ২০১৯ সালে চীনের চ্যাং-ই ৪ মহাকাশযান চাঁদের উল্টো পিঠে অবতরণ করে একটি ক্ষুদ্র বায়োস্ফিয়ার পরীক্ষা চালায়। সেখানে তুলা, আলু, সরিষা গোত্রীয় দানাশস্য, ইস্ট ও ফলের মাছি পাঠানো হয়েছিল। পরীক্ষায় তুলার বীজ অঙ্কুরিত হলেও চাঁদের প্রচণ্ড শীতল রাতে তাপমাত্রা মাইনাস ১৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যাওয়ায় মাত্র ১৪ দিনের মধ্যেই গাছটি মারা যায়। এই ঘটনা চাঁদের প্রতিকূল পরিবেশ এবং উন্নত গ্রিনহাউস প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ সালের শেষ দিকে নাসার আর্টেমিস ৩ মিশনে চাঁদের বুকে লিফ প্রকল্পের আওতায় তিনটি দ্রুত বর্ধনশীল গাছ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে লাগানো হবে। এক সপ্তাহ পর প্রায় ৫০০ গ্রাম গাছের নমুনা পৃথিবীতে এনে বিশ্লেষণ করা হবে। এতে মহাকাশীয় বিকিরণ ও কম মাধ্যাকর্ষণ উদ্ভিদের জিনে কী ধরনের পরিবর্তন আনে, তা যাচাই করা হবে।
এ গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও ব্যবহার করা হচ্ছে। গাছের ডিজিটাল যমজ তৈরি করে আগেভাগে পরীক্ষা করা হবে, মহাকাশে গাছ কীভাবে আচরণ করবে। একই ধরনের খাবার দীর্ঘদিন খেলে যাতে অরুচি না আসে, সে দিকটিও এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিবেচনা করা হবে। এই গবেষণা শুধু চাঁদ বা মঙ্গলে বসতি গড়ার প্রস্তুতি নয়, বরং পৃথিবীর প্রতিকূল পরিবেশে টেকসই কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
সিএ/এমআর


