ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রংপুরে ভোটের লড়াই এখন আর শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ নেই। মোবাইল ফোনের স্ক্রিন, ফেসবুকের টাইমলাইন ও ইউটিউব চ্যানেল হয়ে উঠেছে প্রচারণার নতুন প্রধান ময়দান। প্রচলিত পোস্টার, মাইক আর মিছিলের পাশাপাশি অনলাইন জগতে প্রার্থীদের উপস্থিতি ভোটের সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে ব্যাপক প্রচারণা। প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে বেছে নিয়েছেন শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে। সভা-সমাবেশের ছবি, ভিডিও বক্তব্য, লাইভ অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে লিফলেটের ডিজিটাল সংস্করণ—সবই ঘুরছে ফেসবুক ও ইউটিউবে।
রংপুর জেলায় রয়েছে একটি সিটি করপোরেশন, তিনটি পৌরসভা ও আটটি উপজেলা। প্রায় ৩০ লাখ মানুষের বসবাস এই জেলায়। জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ৪৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়।
রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া) আসনে ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মূল লড়াইয়ে রয়েছেন মো. মঞ্জম আলী (জাতীয় পার্টি), মো. মোকাররম হোসেন (বিএনপি) ও মো. রায়হান সিরাজী (বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী)। এই আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৭২ হাজার ৮৩২ জন। ভোটকেন্দ্র ১৩৯টি, এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ২৩টি।
রংপুর-২ (বদরগঞ্জ–তারাগঞ্জ) আসনে পাঁচজন প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এ টি এম আজহারুল ইসলাম (জামায়াত), আনিছুল ইসলাম মণ্ডল (জাতীয় পার্টি) ও মোহাম্মদ আলী সরকার (বিএনপি)। মোট ভোটার তিন লাখ ৭৮ হাজার ৭০৬ জন। ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৩৭টি।
রংপুর-৩ (সদর) আসনে আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। হেভিওয়েট লড়াইয়ে রয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের, বিএনপির মো. সামসুজ্জামান সামু এবং জামায়াতের মো. মাহবুবুর রহমান বেলাল। এই আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ ৪১ হাজার ৩৬ জন। ভোটকেন্দ্র ১৬৯টি।
রংপুর-৪ (পীরগাছা–কাউনিয়া) আসনে আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মূল লড়াইয়ে রয়েছেন মোহাম্মদ এমদাদুল হক ভরসা (বিএনপি), আবু নাসের শাহ মো. মাহবুবার রহমান (জাতীয় পার্টি) ও আখতার হোসেন (জাতীয় নাগরিক পার্টি)। এখানে ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখ ৬৩ হাজার ৭০ জন। ভোটকেন্দ্র ১৬৩টি।
রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনে প্রার্থী ১০ জন। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন মো. গোলাম রব্বানী (জামায়াত), এস এম ফকরউজ্জামান (জাতীয় পার্টি) ও মো. গোলাম রব্বানী (বিএনপি)। এই আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৬৫ হাজার ৮১০ জন। ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৫২টি।
রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রধান লড়াইয়ে রয়েছেন মো. সাইফুল ইসলাম (বিএনপি), মো. নুরুল আমীন (জামায়াত) ও মো. নুর আলম মিয়া (জাতীয় পার্টি)। মোট ভোটার তিন লাখ ৫৩ হাজার ৬৪২ জন। ভোটকেন্দ্র ১১৩টি।
রংপুর বিভাগে মোট ভোটার সংখ্যা এক কোটি ৩৫ লাখ ২৭ হাজার ১৩৫ জন। বিভাগের ৩৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২২২ জন প্রার্থী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় দেখা যাচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের। হাজার হাজার আইডি থেকে নিয়মিত পোস্ট দিয়ে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাওয়া হচ্ছে। প্রচারণায় সভা-সমাবেশের ছবি, ভিডিও বক্তব্যের পাশাপাশি অতীত সরকারের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতিও তুলে ধরা হচ্ছে।
বিএনপির সহযোগী সংগঠন যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষকদল, মহিলা দল ও ওলামা দলের নেতাকর্মীরাও অনলাইনে সরব। তাদের প্রচারণায় দীর্ঘদিনের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দলের ভূমিকার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
একইভাবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও সমর্থকেরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোরালো উপস্থিতি দেখাচ্ছেন। ফেসবুকে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি ‘কার্ড নয়-কাজ দেব’, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ’—এমন স্লোগান ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। জুলাই আন্দোলনে নিজেদের ভূমিকার দাবিও প্রচারণায় তুলে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি ‘হ্যাঁ ভোট’-এর পক্ষে জোরালো অনলাইন প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
জুলাই আন্দোলনে নিজেদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি বলে দাবি করা এনসিপিও অনলাইনে বিরামহীন প্রচারণা চালাচ্ছে। কোথায় সভা হচ্ছে, কোথায় ভোট চাওয়া হচ্ছে—তার লাইভ ভিডিও ও ছবি নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে। দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা ‘হ্যাঁ ভোট’-এর পক্ষে ডিজিটাল প্রচারণাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও ফেসবুক ও ইউটিউবকে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। কেউ লাইভে এসে বক্তব্য দিচ্ছেন, কেউ শর্ট ভিডিও ও ডিজিটাল পোস্টারের মাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরছেন।
নির্বাচনী তফসিল অনুযায়ী প্রার্থী প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ছিল মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি)। বুধবার (২১ জানুয়ারি) চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক প্রচারণা, যা মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৭টা পর্যন্ত চলবে। ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি)।
রংপুর নগরীর বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, আগে মাইক আর পোস্টারেই নির্বাচন বুঝতাম, এখন ফেসবুক খুললেই দেখা যায় কে কী বলছে। অনেক তথ্য জানা যাচ্ছে।
ধাপ এলাকার ভোটার নাসরিন আক্তার বলেন, ভালো দিক যেমন আছে, তেমনি ভুল তথ্যও থাকে। তবে যাচাই করে দেখলে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়।
রংপুর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে অনলাইন প্রচারণা চালাতে সবাইকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুজনের জন্য নাগরিক রংপুর মহানগর সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, এবারের নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। তরুণ ভোটারদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তবে তথ্য যাচাই না করে বিশ্বাস করলে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইতিবাচক প্রচারণার পাশাপাশি বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকিও রয়েছে। তবে সচেতন ভোটাররা যাচাই-বাছাই করে তথ্য গ্রহণ করছেন। এবারের নির্বাচনে অনলাইন প্রচারণা রংপুরের ভোটের সমীকরণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিএ/এএ


