মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে গ্রিনল্যান্ড দ্বীপকে ঘিরে নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তার দাবি, দ্বীপটির প্রতিরক্ষা ইস্যুতে ভবিষ্যৎ একটি চুক্তির ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ নিশ্চিত হয়েছে, যেখানে বিরল খনিজ সম্পদের ওপর প্রবেশাধিকারও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই আগ্রহের পেছনে গ্রিনল্যান্ডের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থানকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রিনল্যান্ডের ভূগর্ভে বিপুল পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত রয়েছে। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক্স, সবুজ জ্বালানি, সামরিক ও কৌশলগত প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের বিশাল ভাণ্ডারও রয়েছে দ্বীপটিতে। এসব সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতেই ট্রাম্প প্রশাসনের এই আগ্রহ।
ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের যৌথ ভূতাত্ত্বিক জরিপে দেখা গেছে, ইউরোপীয় কমিশন ঘোষিত ৩৪টি ‘ক্রিটিক্যাল র ম্যাটেরিয়ালস’-এর মধ্যে ২৫টিই গ্রিনল্যান্ডে পাওয়া যায়। এর মধ্যে গ্রাফাইট, নাইওবিয়াম ও টাইটানিয়ামের মতো মূল্যবান খনিজ রয়েছে, যা আধুনিক শিল্প ও প্রতিরক্ষা খাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব কেবল প্রতিরক্ষা বিষয়ক নয় বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ। তিনি দ্বীপটির বিরাট বিরল খনিজ সম্পদের কথাও উল্লেখ করেন। যদিও ট্রাম্প কখনো কখনো এসব সম্পদের গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়ে বলেন, মূল উদ্বেগ হলো আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব বাড়ছে।
সম্প্রতি দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, তিনি গ্রিনল্যান্ড চান মূলত নিরাপত্তার স্বার্থে। তার ভাষায়, আর্কটিক অঞ্চলে অনুসন্ধান জটিল ও ব্যয়বহুল, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই পুরু বরফ ভেদ করে নিচে নামতে হয়।
তবে বাস্তবতায় গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদে প্রবেশাধিকার ট্রাম্প প্রশাসনের ভূরাজনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র বিরল খনিজ শিল্পে চীনের আধিপত্য কমাতে এবং নিজের অর্থনৈতিক ও সামরিক নিরাপত্তা জোরদার করতে এই অঞ্চলকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক স্টিভেন ল্যামি মনে করেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ মূলত সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং চীনের প্রভাব ঠেকানোর কৌশলের অংশ।
২০২০ সালে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় কনস্যুলেট চালু করে, যা আর্কটিকে রাশিয়া ও চীনের বাড়তে থাকা তৎপরতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর তার মিত্ররা দ্বীপটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দিকেও জোর দিচ্ছেন।
ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে নতুন সমুদ্রপথ উন্মুক্ত হচ্ছে, একই সঙ্গে মৎস্য, জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ অনুসন্ধানের সুযোগ বাড়ছে। এসব খাতকে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট অগ্রাধিকার ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে।
গত বছর গ্রিনল্যান্ডে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের উদ্দেশে বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজ বলেন, এই অঞ্চল শিপিং লেন, জ্বালানি, মৎস্য সম্পদ এবং নিরাপত্তা নজরদারির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডে একটি মার্কিন খনন প্রকল্পে ১২০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের সম্ভাবনাও অনুমোদন করা হয়েছে। বর্তমানে দ্বীপটির ১০০টি ব্লকে অনুসন্ধান অনুমতি থাকলেও কার্যকর উৎপাদনশীল খনি রয়েছে মাত্র দুটি।
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের আর্কটিক ইনিশিয়েটিভের পরিচালক জেনিফার স্পেন্সের মতে, গ্রিনল্যান্ডে খননের বেশিরভাগ উদ্যোগ এখনো সম্ভাবনার স্তরেই রয়েছে। তবে কৌশলগত নৌপথের অবস্থান ও বিরল খনিজের মজুতই ট্রাম্পের আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
সিএ/এএ


