ইসরাইল ইরানের ওপর সামরিক হামলার সুযোগ খুঁজছে বলে মন্তব্য করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এমন কোনো পদক্ষেপ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) তুরস্কের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাকান ফিদান বলেন, বাস্তবতা হলো—বিশেষ করে ইসরাইল ইরানে আঘাত হানার সুযোগ খুঁজছে। তিনি বলেন, তিনি আশা করেন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো ভিন্ন কোনো পথ বেছে নেবে, তবে বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল উভয় দেশই কি একই অবস্থানে রয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তার মতে এই ক্ষেত্রে ইসরাইলই সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। তিনি জানান, সম্প্রতি ইরান সফরের সময় তিনি তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে এই আশঙ্কার কথা সরাসরি অবহিত করেছেন।
ফিদান বলেন, তেহরান সফরে তিনি বন্ধুর মতো করেই ইরানি নেতাদের বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেছেন। তার ভাষায়, একজন বন্ধুই তিক্ত সত্য তুলে ধরে এবং তিনি সেটাই করেছেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। ওই আলাপে এরদোয়ান বলেন, ইরানে কোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আঙ্কারা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে তুরস্ক অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।
এদিকে শুক্রবার রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, শত্রুপক্ষের যেকোনো হামলাকে তেহরান ‘পরিপূর্ণ যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচনা করবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্য নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে।
পরমাণু ইস্যুতে পরোক্ষ আলোচনার মধ্যেই গত বছরের জুনে ইরানে হামলা চালায় ইসরাইল। এর জবাবে ইরানও ইসরাইলে পাল্টা হামলা শুরু করে। পরিস্থিতি দ্রুত তীব্র সংঘাতে রূপ নেয় এবং এক পর্যায়ে এতে যুক্তরাষ্ট্রও জড়িয়ে পড়ে। মার্কিন বাহিনী ইরানের তিনটি পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালালে তার পাল্টা প্রতিক্রিয়াও জানায় ইরান।
টানা ১২ দিন সংঘাত চলার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক নাটকীয় ঘোষণার মধ্য দিয়ে লড়াই থামে। তবে কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়নি। যুদ্ধ বন্ধ হলেও দুই পক্ষের মধ্যে হুমকি ও পাল্টা হুঁশিয়ারি অব্যাহত থাকে।
চলতি মাসের শুরুতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানান এবং ইরানে হস্তক্ষেপের হুমকি দেন। তবে শেষ পর্যন্ত সে সময় কোনো হামলা চালানো হয়নি।
এরপর বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) ট্রাম্প আবারও হুমকি দিয়ে বলেন, তিনি ইরানকে লক্ষ্য করে উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে একটি নৌবহর পাঠিয়েছেন। মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী ও এর স্ট্রাইক গ্রুপ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে রওনা হয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে।
এই ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। জবাবে ইরানের ওই জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন করে, তাহলে তেহরান উপযুক্ত জবাব দেবে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক সমাবেশ প্রকৃত সংঘাতের উদ্দেশ্যে নয় বলেই তারা আশা করছেন। তবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ইরানের সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে এবং সে কারণেই দেশে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তার ভাষায়, সীমিত, ব্যাপক বা তথাকথিত সার্জিক্যাল—যেকোনো ধরনের হামলাকেই ইরান সর্বাত্মক যুদ্ধ হিসেবে দেখবে এবং কঠোরতম প্রতিক্রিয়া জানাবে।
সিএ/এসএ


