আফগানিস্তান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ভূমিকা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও প্রিন্স হ্যারি। আফগানিস্তান যুদ্ধে ইউরোপীয় সেনারা নাকি সামনের সারিতে ছিল না—ট্রাম্পের এমন বক্তব্যকে অপমানজনক ও সত্যবিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছেন তারা।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর ন্যাটোর যৌথ নিরাপত্তা ধারা কার্যকর করা হলে যুক্তরাজ্যসহ একাধিক মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়ে আফগানিস্তান যুদ্ধে অংশ নেয়। বৃহস্পতিবার এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইউরোপীয় সেনারা যুদ্ধে সামনের সারিতে ছিল না এবং যুক্তরাষ্ট্রের কখনোই তাদের প্রয়োজন হয়নি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনের সময় ন্যাটো পাশে দাঁড়াবে কি না, তা নিয়েও তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার ঝড় ওঠে। যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রম করে সর্বস্তর থেকে নিন্দা জানানো হয়। ফক্স নিউজকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারের প্রতিক্রিয়ায় সাসেক্সের ডিউক প্রিন্স হ্যারি ন্যাটো সেনাদের আত্মত্যাগ নিয়ে ‘সত্য ও সম্মানের সঙ্গে কথা বলার’ আহ্বান জানান।
শুক্রবার আফগানিস্তান যুদ্ধে নিহত ন্যাটো সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রিন্স হ্যারি বলেন, তিনি নিজে আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানে আজীবনের বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছেন এবং বন্ধুদের হারিয়েছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালনের সময় যুক্তরাজ্যের ৪৫৭ জন সেনাসদস্যসহ বহু ন্যাটো সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।
প্রিন্স হ্যারি বলেন, ২০০১ সালে ন্যাটো ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনুচ্ছেদ ৫ কার্যকর করা হয়, যার ফলে যৌথ নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিটি মিত্র দেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ানো বাধ্যতামূলক ছিল। মিত্র দেশগুলো সেই দায়িত্ব পালন করেছে। এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের জীবন চিরতরে বদলে গেছে এবং আত্মত্যাগগুলোর কথা সত্য ও সম্মানের সঙ্গে বলা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘অপমানজনক ও নিন্দনীয়’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, এমন বক্তব্যে নিহত ও আহত সেনাদের পরিবারসহ সারা দেশের মানুষ গভীরভাবে কষ্ট পেয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দেন, নিজে এমন ভুল করলে ক্ষমা চাইতেন।
যুক্তরাজ্যের বাইরে পোল্যান্ড, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের নেতারাও ট্রাম্পের মন্তব্যের সমালোচনা করেন। পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কি বলেন, আফগানিস্তানে সামনের সারিতে দায়িত্ব পালন করা সেনাদের সেবাকে নিয়ে বিদ্রূপ করার অধিকার কারও নেই। কানাডার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ডেভিড জে ম্যাকগিন্টি জানান, কানাডার সেনারা শুরু থেকেই মাঠে ছিলেন এবং কান্দাহার প্রদেশে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ১৫৮ জন সেনা প্রাণ হারান।
ন্যাটোর সাবেক মহাসচিব ইয়াপ দে হুপ স্কেফার বলেন, কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টেরই অধিকার নেই সেনাদের আত্মত্যাগকে খাটো করার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনার প্রত্যাশা করেন।
২০০১ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র তালেবান সরকারকে উৎখাত করতে আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করে। প্রায় ২০ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটবাহিনীর ৩ হাজার ৫০০ জনের বেশি সেনা নিহত হন। তাদের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ছিলেন মার্কিন সেনা। যুক্তরাষ্ট্রের পর সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে যুক্তরাজ্যের, যেখানে ৪৫৭ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন।
সিএ/এএ


