আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) সম্প্রতি গাম্বিয়া বনাম মায়ানমার মামলায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ‘বেঙ্গলি’ হিসেবে অভিহিত করেছে মায়ানমার। গতকাল শুক্রবার ঢাকায় বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি উল্লেখ করে মায়ানমারের এই অপচেষ্টার প্রতি জোরালো আপত্তি জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্র ও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে আন্তরিক অঙ্গীকার প্রদর্শন এবং রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সমান অধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যাবর্তন ও পুনরেকত্রীকরণ নিশ্চিত করতে মায়ানমার এবং রাখাইনে কর্তৃত্বকারী সব পক্ষকে বাংলাদেশ আহ্বান জানায়।
মায়ানমার অতীতেও বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গাদের তৎকালীন ‘বেঙ্গল’ (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে আগত হিসেবে ‘বেঙ্গলি’ হিসেবে অভিহিত করার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এ ধরনের দাবির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আইসিজেতে মায়ানমারের উপস্থাপিত বক্তব্যের মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসনের কৃত্রিম বয়ান তৈরি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকিকে জোরদার করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ২০১৬-১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতা ও জেনোসাইড সম্পর্কিত অপরাধ থেকে দৃষ্টি সরানো এবং তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’কে (নির্মূল অভিযান) সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, রোহিঙ্গারা একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী। তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরাকানে বসবাস করে আসছে। ১৭৮৫ সালে আরাকান বর্মন রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বহু আগে থেকেই তারা এখানে উপস্থিত ছিলেন। প্রাচীন আরাকান রাজধানী মিয়ো-হাউং বা ম্রো-হাউং বা রোহাং এলাকায় তাদের উপস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম ও বৃহত্তর বঙ্গ অঞ্চলে তারা ‘রোশাং’ বা ‘রোহাং’-এর মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরে ক্রমবর্ধমান প্রান্তিকীকরণের প্রেক্ষাপটে এই জনগোষ্ঠী নিজেদের পরিচয়ের জন্য ‘রোহিঙ্গা’ নাম গ্রহণ করে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আধুনিক সীমান্ত নির্ধারণের অনেক আগেই এই অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি ছিল, যা ঐতিহাসিক দলিল, ঔপনিবেশিক জনশুমারি ও স্বাধীন গবেষণায় সুপ্রমাণিত। বার্মার স্বাধীনতার বহু আগেই আরাকানে সুপ্রতিষ্ঠিত জনগোষ্ঠীকে বিদেশি বা অভিবাসী হিসেবে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা ইতিহাসের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসঙ্গত।
১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা মায়ানমারের রাজনীতি, সমাজ ও প্রশাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন। ওই আইনের মাধ্যমে মায়ানমার সরকার তাদের রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে পরিকল্পিতভাবে বাদ দেয়। যদিও অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণ হয়েছিল, রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ভোটাধিকার ভোগ করেছেন। তবে ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাদের সম্পূর্ণভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের রয়েছে স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সামাজিক রীতিনীতি, প্রথা ও ভাষা। বাংলার বিশেষত চট্টগ্রামের উপভাষার সঙ্গে কিছু সাদৃশ্য থাকলেও তা স্পষ্টভাবে ভিন্ন। রোহিঙ্গাদের ‘বেঙ্গলি’ হিসেবে অভিহিত করার পদ্ধতিগত প্রচেষ্টা তাদের আত্মপরিচয় নির্ধারণের অধিকারকে অস্বীকার করে। এই নামকরণ বিতর্ককে ব্যবহার করে তাদের বর্জন, নিপীড়ন এবং ২০১৬-১৭ সালের জাতিগত নির্মূল ও জেনোসাইডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের ‘বেঙ্গলি’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধকরণ মায়ানমার রাষ্ট্রের সুপরিকল্পিত কৌশল। এর মাধ্যমে তাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। যদিও ১৯৭৮ সালের বাংলাদেশ-মায়ানমার দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে তাদের ‘বার্মার আইনসম্মত বাসিন্দা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় রোহিঙ্গাদের মায়ানমার সমাজে সমান সদস্য হিসেবে পুনরেকত্রীকরণের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বিভ্রান্তিকর এই বয়ান রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ থেকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ সরাচ্ছে এবং ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা ক্ষুণ্ন করছে। রোহিঙ্গাদের আত্মপরিচয়ের অধিকার অস্বীকার করা তাদের সম্প্রদায় ধ্বংসের কেন্দ্রীয় কৌশল। এর ফলে তাদের রাখাইন থেকে উত্খাত করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রহীন করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, গত আট বছরেরও বেশি সময় ধরে রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি ও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মায়ানমারের ব্যর্থতা ২০১৭-১৮ সালে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা ও অজুহাত প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করা হয়েছে, যা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ধ্বংসের অভিপ্রায়ের প্রমাণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, ২০২৩ সালের ৬ জুলাই মায়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে উত্থাপিত দাবির প্রতিবাদও বাংলাদেশ জানিয়েছিল। সেই ব্রিফিংয়ে মায়ানমারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ১৯৭১ সালে রাখাইনে প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক আশ্রয় নিয়েছিল। বাংলাদেশ জানিয়েছে, ১৯৭১ সালে রাখাইনের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৭ লাখেরও কম। এ ধরনের দাবির জন্য কোনো জনমিতিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সিএ/এএ


