কম্পিউটার বলতে সাধারণত মানুষ ইলেকট্রনিক চিপ, বিদ্যুৎ ও আধুনিক সফটওয়্যারের কথাই বোঝে। তবে বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক আবিষ্কার সেই ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। পশ্চিম চীনের একটি প্রাচীন সমাধি থেকে উদ্ধার হওয়া প্রায় দুই হাজার বছর পুরোনো এক যন্ত্রকে আধুনিক কম্পিউটারের আদি রূপ হিসেবে বিবেচনা করছেন গবেষকরা। যন্ত্রটির নাম তি হুয়া জি, যা অলংকৃত তাঁত হিসেবেই বেশি পরিচিত। গবেষকদের মতে, এটি বাইনারি বা দ্বিমিক পদ্ধতিতে কাজ করত, যা বর্তমান ডিজিটাল প্রযুক্তির মূল ভিত্তি।
চায়না অ্যাসোসিয়েশন ফর সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বা কাস্টের বিজ্ঞানীরা জানান, যন্ত্রটি আধুনিক কম্পিউটারের মতোই ইনপুট-আউটপুট ও প্রোগ্রামিং নীতিতে পরিচালিত হতো। ২০১২ সালে ছেংদু শহরের মেট্রো লাইন নির্মাণকাজ চলাকালে পশ্চিম হান রাজবংশের একটি সমাধি থেকে চারটি তাঁত যন্ত্রের মডেল উদ্ধার করা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক ও প্রকৌশল বিশ্লেষণের দীর্ঘ গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, যন্ত্রটি ছিল সম্পূর্ণ প্রোগ্রামেবল।
আধুনিক কম্পিউটারে যেমন সফটওয়্যার দিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়, তেমনি এই প্রাচীন তাঁত যন্ত্রে সুতার নকশা সংবলিত প্যাটার্ন কার্ড ব্যবহার করা হতো। এই কার্ডগুলোর মাধ্যমেই নির্ধারিত হতো কোন সুতা ওপরে উঠবে আর কোনটি নিচে নামবে। একে গবেষকরা প্রাচীন প্রোগ্রামিংয়ের একটি কার্যকর উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
ডিজিটাল কম্পিউটারের ভাষা ০ ও ১-এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। একইভাবে এই যন্ত্রে কোনো সুতা ওপরে উঠলে সেটিকে ১ এবং নিচে নামলে ০ হিসেবে গণ্য করা হতো। প্রায় ৯৬ লাখ সুতার সংযোগস্থল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জটিল নকশা তৈরি করা সম্ভব হতো, যা বর্তমান বাইনারি ক্যালকুলেশনের প্রাথমিক রূপ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, আধুনিক বিজ্ঞান ও কম্পিউটিংয়ের সূচনা ইউরোপেই হয়েছে। ১৯৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মিত এনিয়াককে বিশ্বের প্রথম ইলেকট্রনিক কম্পিউটার হিসেবে ধরা হয়। তবে কাস্টের গবেষণা বলছে, চীনা কারিগররা দুই হাজার বছর আগেই অটোমেশন ও তথ্য সংরক্ষণের কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এই প্রযুক্তি সিল্ক রোড ধরে পারস্য হয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ১২শ শতাব্দীতে ইতালির ভেনিসে এই ধরনের তাঁতের ব্যবহার শুরু হয়।
১৮০৫ সালে ফরাসি উদ্ভাবক জোসেফ ম্যারি জ্যাকোয়ার্ড এই ধারণা থেকেই পাঞ্চ কার্ড নিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় তাঁত তৈরি করেন। পরবর্তীকালে এই পাঞ্চ কার্ড পদ্ধতিই উনিশ শতকের শুরুর দিকের কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে ব্যবহৃত হয়। কার্ল মার্ক্স তাঁর ক্যাপিটাল গ্রন্থে জ্যাকোয়ার্ড তাঁতকে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আগের সময়ের সবচেয়ে জটিল যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৯৪৬ সালে এনিয়াক তৈরির প্রকল্পে অন্যতম প্রধান সদস্য ছিলেন চীনা বিজ্ঞানী ঝু চুয়ানজু। অনেক গবেষকের ধারণা, ঝু তাঁর লজিক্যাল স্ট্রাকচার ডিজাইনে প্রাচীন চীনা তাঁত প্রযুক্তি এবং আই চিং দর্শনের বাইনারি চিন্তার অনুপ্রেরণা কাজে লাগিয়েছিলেন।
চীনের বিজ্ঞান জাদুঘরের সাবেক পরিচালক ওয়াং ইউশেং বলেন, এই তাঁত যন্ত্রটি শুধু বস্ত্রশিল্পের একটি সরঞ্জাম নয়; এটি প্রাচীন প্রোগ্রামিং চিন্তা ও যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার এক অনন্য নিদর্শন। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মৌলিক নীতিগুলো গড়ে ওঠার পেছনে এই প্রযুক্তির ভূমিকা নতুনভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
সিএ/এমআর


