ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক সহিংসতার অভিযোগ তুলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকাশ্যে কঠোর বক্তব্যের বিপরীতে বাস্তবে এমন পদক্ষেপ নেওয়া তার জন্য অত্যন্ত কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে চলমান বিক্ষোভকে কার্যকরভাবে সহায়তা করার কোনো সহজ বা বাস্তবসম্মত সামরিক কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। যদিও ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর ট্রাম্প প্রশাসনের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, তবু ইরানের ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান সামরিক প্রস্তুতি বা বাহিনী মোতায়েনের চিত্র দেখা যায়নি। বরং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক উপস্থিতি কমিয়েছে, যা সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি কমিয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরি নেই। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর প্রায় দুই বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে রণতরী উপস্থিত থাকলেও বর্তমানে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ক্যারিবীয় অঞ্চলে এবং ইউএসএস নিমিৎজ যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে ইরানে হামলা চালাতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে কাতার, বাহরাইন, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান বা সৌদি আরবের ঘাঁটি ব্যবহার করতে হবে, যা ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ট্রাম্পের জন্য আরেকটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে গত জুনে ফোরদোতে ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় চালানো দূরপাল্লার বি-২ বোমারু বিমানের মতো অভিযান। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন হামলায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিছুটা দুর্বল হলেও তেহরানের কাছে এখনও প্রায় দুই হাজার ভারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে এবং পাহাড়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা উৎক্ষেপণকেন্দ্রগুলোর পুনর্গঠন চলছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম।
কোন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হবে তা নির্ধারণ করাও জটিল। বিক্ষোভ ও সরকারের দমন-পীড়ন দেশজুড়ে বিস্তৃত হওয়ায় ভুল লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হলে বেসামরিক প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়বে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনাও সীমিত হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন হামলা ইরানি সরকারকে জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিতে এবং নিজেদের পক্ষে জনসমর্থন জড়ো করার সুযোগ দিতে পারে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক রোক্সান ফারমানফারমায়ান বলেন, ইরানে এখনো সুসংগঠিত সরকার, সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা কাঠামো রয়েছে, যা যে কোনো মূল্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রস্তুত। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সরাসরি লক্ষ্য করে হামলার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে, তবে তা আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরেলি জুন মাসে ইরানের অন্তত ৩০ জন শীর্ষ সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে হত্যা করলেও শাসনব্যবস্থা অটুট ছিল। সীমিত মার্কিন হামলায় ইরানি শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। ট্রাম্প নিজেও মাঠে সেনা পাঠানো বা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।
এই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে সাইবার হামলার কথাও বিবেচনায় এসেছে। তবে বিদ্যুৎ বা যোগাযোগ ব্যবস্থায় আঘাত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ, এবং ইন্টারনেট পুনরুদ্ধারের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নও সহজ নয়।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ‘সহায়তা আসছে’ ধরনের বক্তব্যের বিপরীতে বাস্তবতা হলো—ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা সীমিত, আর ঝুঁকি অত্যন্ত উচ্চ।
সিএ/এএ


