রাজধানীতে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে আবারও তিতাস গ্যাসের বিতরণ লাইনে লিকেজ দেখা দিয়েছে। দুর্ঘটনার কারণে গতকাল রাজধানীর উত্তরার গ্যাসের মূল বিতরণ লাইনে সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে উত্তরা, উত্তরখান ও দক্ষিণখানসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ঢাকার গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় এটি তৃতীয় দুর্ঘটনা।
এদিকে চলমান এলপিজি সংকটও কমেনি। বরং কিছু এলাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিয়েছে। ১২ কেজির ১ হাজার ৩০৬ টাকার সিলিন্ডার কোথাও কোথাও তিন হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ হচ্ছে, বেশি দাম দিয়েও এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে রাজধানীর হাজারো ঘরে কার্যত চুলা জ্বলছে না।
গ্যাস না থাকায় অনেকেই বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা বা ইনডাকশন কুকারের দিকে ঝুঁকছেন। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এসব যন্ত্রও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবহারকারীরা। মিরপুর ১০-এর বাসিন্দা পরশ আহমেদ জানান, ১০ দিন ধরে তাঁদের বাসায় গ্যাস নেই। বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। ঢাকার বছিলা এলাকার বাসিন্দা দেলওয়ার হোসেন বলেন, তিন দিন আগে সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়ে গেছে। এরপর নিজের এলাকা থেকে শুরু করে মোহাম্মদপুর ঘুরেও একটি সিলিন্ডার জোগাড় করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার রাতে একটি ইনডাকশন কুকার কিনতে হয়েছে, সেটিও কয়েকটি দোকান ঘুরে বেশি দামে।
বারবার দুর্ঘটনায় বিপর্যস্ত বিতরণ ব্যবস্থা
তিতাস গ্যাস সূত্রে জানা গেছে, উত্তরা টঙ্গী ব্রিজের কাছে এক শিল্প গ্রাহকের সার্ভিস লাইনের একটি ভাল্ভ ফেটে উচ্চচাপে গ্যাস লিকেজ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তাৎক্ষণিকভাবে উত্তরার মূল পাইপলাইন থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা হয়। গতকাল রাতে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তিতাস জানায়, লিকেজের কারণে উত্তরার ১২ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন শাটডাউন করা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভাল্ভটি প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
তিতাসের তথ্যমতে, এই ধরনের ভাল্ভ পাইপলাইনে গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয় এবং বিতরণ লাইনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এগুলো বসানো থাকে। একটি ভাল্ভ বিকল হলে পুরো এলাকার সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। সাময়িক এই অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে তিতাস কর্তৃপক্ষ।
তবে নগরবাসীর বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এই সাময়িক সমস্যাই এখন নিয়মিত ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। গত এক মাস ধরে ঢাকাজুড়ে পাইপলাইনের গ্যাসে ভয়াবহ স্বল্পচাপ চলছে। দিনের বেশির ভাগ সময়ই চুলায় আগুন জ্বলে না। তার ওপর একের পর এক দুর্ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
এর আগে ৪ জানুয়ারি তুরাগ নদীর নিচে গ্যাস পাইপলাইনে ছিদ্র দেখা দিলে মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। এর প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এরপর ১০ জানুয়ারি গণভবনের সামনে একটি ভাল্ভ বিস্ফোরণে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ওই দিন রাতে নতুন ভাল্ভ বসিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হলেও গ্রাহকদের ভোগান্তি ছিল চরমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একের পর এক দুর্ঘটনা এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফলে ঢাকার গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থা বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সংকট থেকে উত্তরণে শুধু তাৎক্ষণিক মেরামত নয়, পুরো বিতরণ নেটওয়ার্কের টেকসই সংস্কার এখন জরুরি।
এ বিষয়ে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেন, ‘তিতাসের বিতরণ ব্যবস্থা জীর্ণ। এর মধ্যেই চুরি বেড়ে গেছে। তাই প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটছে।’ তিনি জানান, গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহের চেষ্টা চলছে।
দীর্ঘায়িত হচ্ছে এলপিজি ভোগান্তি
মাসখানেক ধরে চলা এলপিজি সংকট এক সপ্তাহের মধ্যেই কেটে যাবে—গত সপ্তাহে ব্যবসায়ী ও সরকারের পক্ষ থেকে এমন আশার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। বরং এলাকা ভেদে সিলিন্ডারের দাম আরও বেড়েছে। একজন এলপিজি ব্যবসায়ী জানান, সহসা এই নৈরাজ্য কমার সম্ভাবনা কম। তাঁর মতে, ফেব্রুয়ারিতে গিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে। চলতি মাসে একটি জাহাজ এলপি গ্যাসের উপাদান নিয়ে দেশে আসার কথা রয়েছে, সেটি এলে ভোগান্তি কিছুটা কমতে পারে।
সিএ/এএ


